বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় জাহাঙ্গীরনগরের ‘ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টার’

জাবি প্রতিনিধি

শিক্ষা

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ প্রান্তের ঘন সবুজে বাতাসে ভেসে আসছে পাখির ডাক। কোথাও বাঁশঝাড়ের পাতায়

2026-08-17T15:41:59+00:00
2026-08-17T15:49:38+00:00
 
  সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬,
২ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
শিক্ষা
বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় জাহাঙ্গীরনগরের ‘ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টার’
জাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৪১ পিএম  আপডেট: ১৭.০৮.২০২৬ ৩:৪৯ পিএম
জাহাঙ্গীরনগরের অভয়ারণ্য। ছবি : সময়ের আলো
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ প্রান্তের ঘন সবুজে বাতাসে ভেসে আসছে পাখির ডাক। কোথাও বাঁশঝাড়ের পাতায় শিশির, কোথাও গাছের ডালে জড়িয়ে থাকা অর্কিড, আবার কোথাও মাটির বুক চিরে উঠে আছে অসংখ্য উইপোকার ঢিবি। নীরবতার ভেতর হঠাৎ নড়েচড়ে ওঠে কোনো অচেনা প্রাণী। দূর থেকে মনে হতে পারে, এটি বুঝি গভীর কোনো বন। কিন্তু এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেরই অংশ। প্রায় ৫ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই সবুজ ভূখণ্ডের নাম ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টার (ডব্লিউআরসি)।

এখানে বন্যপ্রাণীদের প্রদর্শন করা হয় না; বরং তাদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। লোকালয়ে ধরা পড়া, অসুস্থ কিংবা আহত প্রাণীকে উদ্ধার করে চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর উপযুক্ত পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে চলে প্রাণীদের আচরণ, জীবনধারা, প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা। অর্থাৎ, এখানে একটি প্রাণীর গল্পের শেষ হয় খাঁচায় নয়; সম্ভব হলে আবারও প্রকৃতির কাছেই।

শুরুটা হয়েছিল গবেষণার প্রয়োজন থেকে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজের উদ্যোগে ২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করে ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টার। মাঠপর্যায়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি এবং বিপন্ন বন্যপ্রাণীর জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। প্রতিষ্ঠার সময় এটি ছিল দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও গবেষণার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী একটি উদ্যোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের হাতে-কলমে বন্যপ্রাণীর আচরণ পর্যবেক্ষণ, তাদের জীবনযাপন বোঝা এবং সংরক্ষণ কৌশল নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয় এখানে।


সংশ্লিষ্টরা জানান, মাঠপর্যায়ে গবেষণার প্রয়োজনেই মূলত ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এখানে বিভিন্ন বিপন্ন প্রাণীর বংশবৃদ্ধিও করানো হয়েছে, যা গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শুরুর দিকেই কেন্দ্রটি বিপন্ন প্রাণীর প্রজনন ও সংরক্ষণে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরু করে। ২০০৫ সালে নড়াইল থেকে দুটি ভোঁদড় আনা হয়েছিল। দুই বছরের মধ্যেই সেই ভোঁদড় ৪টি বাচ্চা দেয়। পরে নানা প্রতিকূলতার কারণে ২০০৮ সালে সেগুলো সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়।

অর্থের সীমাবদ্ধতায় পরবর্তী সময়ে বিপন্ন প্রাণীর বংশবৃদ্ধির কাজ বড় পরিসরে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে, পর্যাপ্ত অর্থ ও আধুনিক সুবিধা পাওয়া গেলে আবারও এ ধরনের কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

আহত প্রাণীর শেষ ভরসা
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বসতি যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই বন্যপ্রাণীদের সঙ্গে মানুষের সংঘাত বাড়ছে। খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে সাপ, গুইসাপ, বাগডাশ কিংবা শিয়াল। কখনো মানুষের হাতে আহত হয়, কখনো যানবাহনের ধাক্কায়, আবার কখনো ঝড়-বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তারা।


এসব প্রাণীর অনেকেরই ভাগ্যে জোটে না নিরাপদ চিকিৎসা কিংবা পুনর্বাসনের সুযোগ। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারের ভূমিকা।

ক্যাম্পাস কিংবা আশপাশের এলাকা থেকে কোনো অসুস্থ বা আহত প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেলে, সেটিকে উদ্ধার করে আনা হয় এখানে। এরপর পর্যবেক্ষণ, খাবার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। অবস্থা গুরুতর হলে নেওয়া হয় পশু হাসপাতালে।

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান জানান, কোনো প্রাণী অসুস্থ বা আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় পাওয়া গেলে প্রথমে সেটিকে উদ্ধার করে রেসকিউ সেন্টারে আনা হয়। সেখানে খাবার দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন হলে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করা হয়। গুরুতর অবস্থায় প্রাণীকে সাভার পশু হাসপাতালে নেওয়া হয়।

সুস্থ হওয়ার পর প্রাণীটির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়- কোথায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। যদি জাহাঙ্গীরনগরের পরিবেশে সেটি স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকতে পারে, তাহলে রেসকিউ সেন্টারেই অবমুক্ত করা হয়। আর স্থানীয় পরিবেশে টিকে থাকার উপযোগী না হলে, তাকে উপযুক্ত প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

খাঁচা এখানে স্থায়ী ঠিকানা নয়
ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারে থাকা খাঁচাগুলো দেখলে চিড়িয়াখানার কথা মনে হতে পারে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে খাঁচা কোনো প্রাণীর স্থায়ী আবাস নয়। আহত বা অসুস্থ অবস্থায় আসা প্রাণীর জন্য এটি সাময়িক নিরাপদ আশ্রয়। ঝড়ে আহত হয়ে ডানা বা পা ভেঙে যাওয়া কোনো পাখি এখানে কিছুদিন পরিচর্যায় থাকতে পারে। একইভাবে ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী- খরগোশ, কাঠবিড়ালি, বেজি কিংবা অন্য কোনো প্রাণীও সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদে রাখা হয়।


প্রকৃতপক্ষে, রেসকিউ সেন্টারের দর্শনই হলো বন্যপ্রাণীকে যত দ্রুত সম্ভব তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেওয়া। এ পর্যন্ত মেছোবাঘ, বাগডাশ, বনবিড়াল, শিয়াল, বানর, কচ্ছপ, গুইসাপ, লক্ষ্মীপ্যাঁচা, হুতুম প্যাঁচাসহ নানা প্রজাতির প্রাণী চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হয়েছে। গত তিন বছরে উদ্ধার, চিকিৎসা ও অবমুক্ত করা প্রাণীর সংখ্যা অন্তত ১০০ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অজগর থেকে বাগডাশ-ফিরেছে অনেকেই
২০০৬ সালে শ্রীমঙ্গলের একটি চা-বাগান থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল একটি অজগর। বেশ কিছুদিন রেসকিউ সেন্টারে রেখে সেটির চিকিৎসা ও পরিচর্যা করা হয়। সুস্থ হওয়ার পর আবারও তাকে শ্রীমঙ্গলের উপযুক্ত পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়েও উদ্ধার হয়েছে বিভিন্ন প্রাণী। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি বাগডাশ উদ্ধার করে চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারে অবমুক্ত করা হয়েছিল।

এসব ঘটনা হয়ত সংখ্যায় ছোট। কিন্তু প্রতিটি প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৃহত্তর একটি পরিবেশগত ভারসাম্য। কারণ, প্রকৃতিতে কোনো প্রাণীই অপ্রয়োজনীয় নয়। একটি সাপ যেমন ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে, তেমনি একটি শিয়াল বা বাগডাশও খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি প্রাণীর হারিয়ে যাওয়া কখনো কখনো পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।

৫ একরের ভেতর আরেকটি ছোট্ট বন্যজগৎ
রেসকিউ সেন্টারের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে এর আলাদা পরিবেশ। গহীন সবুজের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা। রয়েছে বাঁশঝাড়, ঝোপঝাড়, গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ এবং অসংখ্য উইপোকার ঢিবি। এখানকার উইপোকার ঢিবিগুলো শুধু মাটির উঁচু-নিচু কাঠামো নয়। অনেক বন্যপ্রাণীর জীবনচক্রের সঙ্গেও এগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। গুইসাপের বাচ্চা উৎপাদনের ক্ষেত্রে এগুলো প্রাকৃতিক ইনকিউবেটর হিসেবেও কাজ করে।


দেশের বিভিন্ন বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য থেকে অর্কিড সংগ্রহ করে এখানে সংরক্ষণের চেষ্টাও চলছে। গাছের ডালে জন্মানো এসব অর্কিড ধীরে ধীরে শিকড় বিস্তার করে, পরে ফুটিয়ে তোলে ফুল। ফলে, এই ৫ একর জায়গা শুধু প্রাণীদের আশ্রয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে উদ্ভিদ, প্রাণী, জলাশয় ও ক্ষুদ্র জীবের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি ছোট্ট প্রতিবেশ।

জাহাঙ্গীরনগরের অতিথিদের প্রথম ঠিকানা
শীত এলেই বদলে যায় ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারের চেহারা। উত্তরের শীতল অঞ্চল পেরিয়ে অতিথি পাখিরা যখন বাংলাদেশে আসে, তাদের অনেকেরই প্রথম গন্তব্য হয় এই কেন্দ্রের জলাশয়। পরে সেখান থেকে তারা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য লেকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অসংখ্য জলাশয় থাকলেও ডব্লিউআরসির লেকে পাখির উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি। কারণ, এখানে মানুষের যাতায়াত কম এবং শব্দদূষণও তুলনামূলকভাবে কম। সংশ্লিষ্ট গবেষকদের পর্যবেক্ষণে, এই এলাকায় সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ থেকে ৮০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। একপর্যায়ে গত ডিসেম্বরের এক দিনে এই জলাশয়ে চার থেকে ৫ প্রজাতির প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার অতিথি পাখির অবস্থানের তথ্যও পাওয়া যায়।

জলাশয়ের পানিতে একসঙ্গে অসংখ্য পাখির ভেসে থাকা, ডানা মেলে উড়ে যাওয়া কিংবা সন্ধ্যায় দল বেঁধে ফিরে আসার দৃশ্য তখন পুরো এলাকাকে পরিণত করে এক প্রাকৃতিক পাখিরাজ্যে।

জঙ্গলের নীরব চোখ-ক্যামেরা ট্র্যাপ
এই জঙ্গলে বন্যপ্রাণীদের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণের জন্য রয়েছে আরেক অভিনব ব্যবস্থা- ক্যামেরা ট্র্যাপ। গাছের আড়ালে বা প্রাণীদের চলাচলের সম্ভাব্য স্থানে বসানো ক্যামেরাগুলো নীরবে অপেক্ষা করে। প্রাণী ক্যামেরার সামনে এলেই সেন্সর সক্রিয় হয় এবং ছবি ধারণ করে। কখনো গভীর রাতে একটি শিয়াল, কখনো গুইসাপ, কখনো অন্য কোনো প্রাণী-মানুষের চোখের আড়ালে তাদের চলাচল ক্যামেরায় ধরা পড়ে।


প্রাণীর আচরণ, চলাচলের ধরন, কোন এলাকায় কোন প্রজাতির উপস্থিতি বেশি- এসব তথ্য গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, এখানে প্রকৃতি শুধু সংরক্ষণ করা হয় না; প্রকৃতিকে বোঝারও চেষ্টা করা হয়।

প্রাণীরা নিজেরাই তৈরি করছে নতুন প্রজন্ম
কাঁটাতারের বেড়া ঘেরা নির্জন ও তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশের কারণে এখানে থাকা কিছু প্রাণী স্বাভাবিকভাবেই বংশবিস্তার করছে। বর্তমানে বিভিন্ন প্রজাতির উভচর, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপস্থিতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। রয়েছে বাগডাশ, শিয়াল, বনবিড়াল, মেছোবাঘ, বেজি, গুইসাপ, বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ এবং নানা পাখি। কিছু প্রাণী এখানে ডিমও পাড়ে। উপযুক্ত পরিবেশ থাকায় তারা নিজেদের জীবনচক্র অনেকটা স্বাভাবিকভাবেই সম্পন্ন করতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে কয়েকটি বিপন্ন প্রজাতির বংশবৃদ্ধির জন্য এই কেন্দ্রকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। চিড়িয়াখানাগুলোতে সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় বিপন্ন প্রাণীর বংশবৃদ্ধি সম্ভব হয় না। প্রয়োজনীয় সুবিধা ও অর্থায়ন পাওয়া গেলে রেসকিউ সেন্টারে এ ধরনের কাজ করা সম্ভব।

যে প্রাণীকে সবাই চায় না, তাদের জন্যও দরকার আশ্রয়
বন্যপ্রাণী উদ্ধারের পর কোথায় রাখা হবে- এটিও একটি বড় প্রশ্ন। অনেক সময় চিড়িয়াখানা বা সাফারি পার্কে অসুস্থ কিংবা আহত প্রাণী নেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ প্রাণীটির চিকিৎসা, খাবার ও পরিচর্যার জন্য আলাদা ব্যয় প্রয়োজন হয়। আবার, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই নির্দিষ্ট বাজেট ও সক্ষমতা রয়েছে। ফলে, উদ্ধার করা একটি প্রাণী সময়মতো আশ্রয় ও চিকিৎসা না পেলে মারা যেতে পারে। এই বাস্তবতায় ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারের মতো প্রতিষ্ঠান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি প্রাণীকে শুধু উদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়; তাকে সুস্থ করে নিরাপদ পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিই সংরক্ষণের অংশ।

অর্থসংকট বড় চ্যালেঞ্জ
সম্ভাবনার পাশাপাশি ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারের সামনে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। প্রয়োজন আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, উন্নত অবকাঠামো, প্রাণীদের জন্য বিশেষায়িত এনক্লোজার, পর্যাপ্ত খাবার, দক্ষ জনবল এবং নিয়মিত গবেষণা অর্থায়ন। প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে বিপন্ন প্রাণীর প্রজনন নিয়ে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে সেটি ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে পর্যাপ্ত অর্থায়ন পাওয়া গেলে এই কেন্দ্রের সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব। তাহলে শুধু উদ্ধার ও চিকিৎসা নয়, বিপন্ন প্রাণীর পুনর্বাসন, প্রজনন এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণেও আরও বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

প্রকৃতিকে তার বাসিন্দাদের ফিরিয়ে দেওয়ার গল্প
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারের গল্প আসলে কোনো খাঁচার গল্প নয়। এটি একটি আহত পাখির আবার ডানা মেলার গল্প। একটি অসুস্থ গুইসাপের সুস্থ হয়ে জঙ্গলে ফিরে যাওয়ার গল্প। একটি বাগডাশের নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার গল্প। একটি অজগরের আবার নিজের আবাসস্থলে ফিরে যাওয়ার গল্প। আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক নতুন করে ভাবার গল্প। প্রকৃতি মানুষের জন্য নয়, আবার মানুষও প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। একটি সুস্থ পরিবেশের জন্য প্রয়োজন প্রাণী, উদ্ভিদ, জলাশয় ও মানুষের সহাবস্থান।

জাহাঙ্গীরনগরের ৫ একর সবুজ তাই শুধু একটি রেসকিউ সেন্টার নয়; এটি একটি বার্তা- বন্যপ্রাণীকে বাঁচানোর অর্থ প্রকৃতিকে বাঁচানো, আর প্রকৃতিকে বাঁচানোর অর্থ শেষ পর্যন্ত নিজেদের ভবিষ্যৎকেই নিরাপদ করা। ঘন জঙ্গলের ভেতর হয়ত আবারও কোনো ক্যামেরা ট্র্যাপের সামনে দিয়ে হেঁটে যাবে একটি শিয়াল। জলাশয়ের পানিতে নেমে পড়বে অতিথি পাখির ঝাঁক। কোনো গাছের ডালে ফুটবে অর্কিড। আর কোনো একদিন লোকালয় থেকে উদ্ধার করা একটি আহত প্রাণী সুস্থ হয়ে যখন আবারও মুক্ত প্রকৃতিতে ছুটে যাবে- তখন প্রমাণ হবে, মানুষের হাতে ধরা পড়া একটি জীবনও আবার প্রকৃতির কাছে ফিরতে পারে। কারণ, বন্যপ্রাণীর শেষ ঠিকানা খাঁচা নয়, প্রকৃতি।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   বন্যপ্রাণী  নিরাপদ  আশ্রয়  জাহাঙ্গীরনগর  ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টার  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: