তিন ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে আবার তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম নগরীর নিচু এলাকা। সবখানে দেখা গেছে একই চিত্র। হাঁটু থেকে কোমর পানি। নগরীর বড় অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। বর্ষা মৌসুম শেষ হলেও জলাবদ্ধতার দুঃখ যাচ্ছে না। ভারী বৃষ্টিতে আবার সড়ক-খাল একাকার হয়ে গেছে। বিশাল এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় বরাবরের মতো জলাবদ্ধতা প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শুধু খাল খনন করলে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে না। নগরবাসী সচেতন না হলে চলমান সংকটের স্থায়ী সমাধান নেই।
নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান সময়ের আলোকে বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে সোমবার নিচু এলাকা তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প কাজ শেষের পথে। এ অবস্থায় প্রকল্প কাজের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা নগরবাসী কতটুকু সচেতনতাও বিবেচনার বিষয়।
খালের বর্জ্য জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তির পথে বড় বাধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য নগরবাসী খাল নালায় ফেলছে। খাল যতই খনন করা হোক যতই গভীর করা হোক জমে থাকা বর্জ্য বৃষ্টির পানি সরতে দেয় না। পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হলেই খাল উপচে পড়ে। তখন সড়ক, খাল, বাসাবাড়ি, দোকানপাট পানিতে একাকার হয়ে যায়।
সোমবার সকালেও চট্টগ্রাম নগরীর পরিস্থিতির জন্য নগরবাসীর অসচেতনতা অনেকটা দায়ী। খাল বর্জ্যমুক্ত না রাখা পর্যন্ত পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।
এদিকে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস সোমবার ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১৩৭ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ সুমন সাহা সময়ের আলোকে বলেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকা লঘুচাপ এবং নিম্নচাপের প্রভাবে ভারী বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিপাত আরও তিন থেকে চার দিন অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি পাহাড় ধসের সতর্কতাও আছে। চার সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
রোববার রাত ১০টার পর থেকে টানা বৃষ্টিপাত শুরু হয়। রাতভর হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়। সোমবার ভোররাত থেকে শুরু হয় ভারী বৃষ্টিপাত। সকালেই বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় চট্টগ্রাম নগরীর নিচু এলাকা। এতে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জলজট। কোথাও হাঁটু আবার কোথাও কোমরসমান পানি। বহদ্দারহাট, চান্দগাঁও, সিঅ্যান্ডবি, ষোলশহর, চকবাজার, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, প্রবর্তক, জামালখান, মুরাদপুর, জিইসি, আগ্রাবাদ, রিয়াজ উদ্দিন বাজার, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যায়।
এসব এলাকায় দুপুর ১২টা পর্যন্ত সড়কে ছিল হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। এতে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। জলমগ্ন নিচ তলার বাসাবাড়ি, মার্কেট ও দোকানপাটে পানি ঢুকে গেছে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্ধীদের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা স্থগিত করা হয় প্রায় সব স্কুলে। সকালে গন্তব্যে যেতে পথচারী, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবিরা চরম দুর্ভোগ পোহান। সোমবার সকালে ষোলশহর রেলস্টেশনে ৪ ঘণ্টা দাঁড়িয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়মুখী শাটল ট্রেন। ট্রেন লাইন ডুবে যাওয়ায় এই অবস্থা। এতে শিক্ষার্থীরা দুর্ভোগে পড়েন।
নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মুহূর্তে কমে যায় গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের সংখ্যা। এ সময় অনেকে প্যাডেলচালিত রিকশায় করে বাড়তি ভাড়ায় চলাচলে বাধ্য হন। কেউ পানি মাড়িয়ে হেঁটে রওনা দেন গন্তব্যে।
নগরীর জামালখান এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আনিস বলেন, নগরীর মধ্যে উঁচু এলাকা হিসেবে পরিচিত জামালখান এলাকা। খুব বেশি বৃষ্টি না হলে সড়কে পানি ওঠে না। কিন্তু এই এলাকায় সোমবার সকালের চিত্র ছিল ভয়াবহ। পুরো এলাকার সড়কে ছিল কোমর পানি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি কমতে থাকে। বিশাল এলাকায় পানিতে ডুবে থাকায় নগরীর ব্যস্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত এখানে জনজীবন থমকে যায়।
নগরীর চকবাজার এলাকার বাসিন্দা জেসমিন আক্তার বলেন, চকবাজারে মাঝেমধ্যে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সোমবার সকালে জলাবদ্ধতার যে রূপ দেখা গেছে এক কথায় অবিশ্বাস্য। চকসুপার মার্কেট থেকে গুলজার টাওয়ার সবখানে নিচু এলাকায় ছিল পানি। চকবাজার কাঁচাবাজার এলাকার পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। পানিতে টইটম্বুর অবস্থায় ছিল দুপুর ১২টা পর্যন্ত।
নগরীর রিয়াজ উদ্দিন বাজারের তামাকুমন্ডি লেনের ব্যবসায়ী নাছির উদ্দিন বলেন, অনেক দিন পর নগরীর বড় পরিসরের এই মার্কেট জলমগ্ন হয়েছে। এই লেন ছাড়াও আশপাশে যেন দুর্যোগ নেমে এসেছিল। প্রায় প্রতিটি দোকানে পানি প্রবেশ করায় বিপুল পণ্য নষ্ট হয়েছে। এখানকার সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিচ তলায় হওয়ায় ব্যবসায়ীদের বিপুল ক্ষতি হয়েছে।
নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ পেয়ারু বলেন, বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টিতে আবাসিক এলাকা একবার ডুবেছিল। ওই সময় বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বর্ষা শেষে সাধারণত এই সময়েও এভাবে নিচু এলাকা তলিয়ে যায় না। সোমবার ভোর থেকে সকালের চিত্র ছিল ভয়াবহ। আবাসিক এলাকার প্রতিটি গলি পানিতে তলিয়ে যায়। এই এলাকার সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে। সকালে সাময়িক পরীক্ষাও বাতিল করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্মকর্তারা জানান, আবহাওয়ার তিন নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল থাকায় বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে সব ধরনের পণ্য ওঠানামা বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে অন্তত ৫০টির বেশি বড় জাহাজে পণ্য ওঠানামা বন্ধ। দৈনিক অন্তত দেড় লাখ টন পণ্য লাইটার জাহাজে করে বিভিন্ন ঘাটে এনে খালাস করা হয়। বহির্নোঙর থেকেই পণ্য খালাস শেষ করে বিভিন্ন নৌ বন্দরের উদ্দেশে রওনা দেয় লাইটার জাহাজ। সতর্ক সংকেতের কারণে তাও বন্ধ হয়ে আছে। অন্তত ২ শতাধিক লাইটার জাহাজ নোঙর করে আছে কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা : চট্টগ্রাম নগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে জলাবদ্ধতার সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলছে না বলে মনে করা হচ্ছে। হাজার কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প শেষের পথে। কিন্তু প্রকল্পের সুফল নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। সুফল কবে, কখন মিলবে দিনক্ষণ নিয়েও আছে মতভেদ। ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খাল থেকে বর্জ্য অপসারণ করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। খালের ভেতর গড়ে ওঠা প্রায় সাড়ে তিন হাজার স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু বর্জ্য অপসারণ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের। নগরবাসীর যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা ও চসিকের বর্জ্য সংগ্রহে গাফিলতি আছে। খালগুলো পরিষ্কার না করতেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের সব কাজ শেষ হলে দৃশ্যমান হবে সুফল। সব কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুফল শতভাগ মিলবে না। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প শেষ হতে চললেও এখন অনেক কাজ বাকি। তাই আমাদের একেবারে শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে আমাদের জোর দিতে হবে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) জানায়, নগরীতে বর্তমানে ৭০ লাখ মানুষের বসবাস। বছরে বর্জ্য উৎপাদন হয় ১৯ লাখ টন। চসিক বর্জ্য সংগ্রহ করে মাত্র ৯ লাখ টন। বাকি ১০ লাখ টন বর্জ্য নিয়মিত পড়ছে খাল, নালা, নদীতে। বিপুল বর্জ্য সংগ্রহ করতে না পারা নগরীর জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। বর্জ্য সংগ্রহ করলেও ব্যবস্থাপনায় তেমন কোনো উদ্যোগ নেই চসিকের। আবার কারিগরি সক্ষমতাও নেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা জরুরি। অন্যথায় জলাবদ্ধতা নিরসনে সাড়ে ১৪ হাজার কোটির চার প্রকল্পের সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে