ভুল খননে নদীর গতি বদলে যাওয়ায় ভাঙনের ভয়

কাজী শহিদুল হক রাজু, সাতক্ষীরা

সারাদেশ

সাতক্ষীরার বেতনা ও খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। নিয়ম না মেনে অপরিকল্পিতভাবে নদী খননের ফলে সাতক্ষীরা সদর ও

2026-08-18T05:12:08+00:00
2026-08-18T05:12:08+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬,
৩ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
ভুল খননে নদীর গতি বদলে যাওয়ায় ভাঙনের ভয়
কাজী শহিদুল হক রাজু, সাতক্ষীরা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ৫:১২ এএম 
সাতক্ষীরার বেতনা ও খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে । ছবি : সময়ের আলো
সাতক্ষীরার বেতনা ও খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। নিয়ম না মেনে অপরিকল্পিতভাবে নদী খননের ফলে সাতক্ষীরা সদর ও আশাশুনিসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় এ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে বিস্তীর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি, ফসলি জমি মাছের ঘের তলিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে রয়েছে এলাকাবাসী।

বেতনা নদীর ভাঙনকবলিত এলাকার মধ্যে রয়েছে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বিনেরপোতা ব্রিজের পূর্ব পাশে জেলেপাড়া এলাকা, আশাশুনির বুধহাটা বাজার ও নওয়াপাড়া এলাকা। আশাশুনির অন্যতম প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্র বুধহাটা বাজারটি এখন বিলীনের পথে।

খালপেটুয়া নদীর ভাঙনে আশাশুনি উপজেলার বড়দল ও খাজরা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার বিঘা মৎস্য ঘের ও ফসলি জমি ও জনবসতি পানিতে তলিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বিনেরপোতা ব্রিজের পূর্ব পাশে জেলেপাড়া এলাকায় বেতনা নদীর তীররক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিলেও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও লাবসা ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে রশি টানাটানির কারণেই ভাঙনকবলিত এলাকায় সংস্কারকাজ শুরু হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এদিকে নদীভাঙন অব্যাহত থাকায় বিনেরপোতা জেলেপাড়া এলাকায় বসবাসকারী দেড় শতাধিক পরিবার নদীগর্ভে বসতভিটা ও সম্পদ হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন রোধ করা না গেলে বর্ষার পানির চাপ ও নদীর প্রবল স্রোতে বাঁধের আরও বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিনেরপোতা ব্রিজের কাছে বেতনা নদীর পশ্চিম তীরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখল করে শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ‘হাসান ফুড এন্ড বেভারেজ’-এর তিন ইউনিটের একটি বড় কারখানা। নদী খননের সময় ওই প্রতিষ্ঠানকে রক্ষার জন্য নদীর পূর্ব তীরে বিনেরপোতা গ্রামের জেলাপাড়া এলাকার দিকে তুলনামূলক বেশি খনন করা হয়েছে। এভাবে অপরিকল্পিতভাবে নদী খননের ফলে নদীর পানির প্রবাহের গতিপথ ও চাপের পরিবর্তন হয়েছে। এতে পানির স্রোত সরাসরি জেলেপাড়া এলাকার বাঁধে আঘাত করছে। ফলে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকে বাঁধের ভাঙন দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।

এ বিষয়ে লাবসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল আলিম বলেন, নদীভাঙন প্রতিরোধের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের। বার বার বলা স্বত্বেও নদীভাঙন প্রতিরোধে পাউবো সেখানে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এ ছাড়া নদীভাঙন রোধে কাজ করার মতো ইউনিয়ন পরিষদের পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহমান তাযকিয়া বলেন, বিনেরপোতা এলাকায় বেতনা নদীর ভাঙনের বিষয়টি আমরা অবগত আছি। কিন্তু যেসব পয়েন্টে ভাঙন লেগেছে, ওই বাঁধটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন নয়। যে কারণে ভাঙন পয়েন্টের বাঁধ মেরামতে আমরা কোনো উদ্যোগ নিতে পারছি না। তবে বেতনা নদী খননের সময় তিনি ওই স্টেশনে দায়িত্বে ছিলেন না বলেও জানান তিনি।


এদিকে দুই দফতরের বক্তব্যে বিপাকে পড়েছে এলাকাবাসী। পাউবো বলছে, ভাঙনকবলিত বাঁধ তাদের আওতাধীন নয়। অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদ বলছে, বাঁধটি তাদের আওতাধীন হলেও নদীভাঙন প্রতিরোধের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ফলে দুই পক্ষের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে বাস্তবে ভাঙন প্রতিরোধে কে কাজ করবে তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। জরুরি ভিত্তিতে বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।’

স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে দুই পক্ষের এই ‘রশি টানাটানি’ অব্যাহত থাকলে একদিকে যেমন বাঁধের ভাঙন বাড়বে, অন্যদিকে তেমনি ঝুঁকির মুখে পড়বে জেলেপাড়ার দেড় শতাধিক পরিবার। তাই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে তার বিপাকে পড়বেন।

এদিকে বেতনা নদীর ভাঙনে আশাশুনির অন্যতম প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্র বুধহাটা বাজারটি এখন বিলীনের পথে। দুই শতাব্দীর পুরোনো এই গ্রামীণ মোকামটিতে প্রতি সপ্তাহে কোটি কোটি টাকার পণ্য কেনাবেচা হয়, যার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভর করে আছেন অঞ্চলের অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ। বিশেষ করে শুক্রবারের হাটে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় পশুর হাট বসে। অথচ বেতনা নদীর প্রবল স্রোতের তোড়ে বাজার-সংলগ্ন প্রতিরক্ষা বাঁধ ধসে নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে, যা পুরো বাজারটিকে অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, বড়দল ও খাজরা ইউনিয়নের সীমানা-সংলগ্ন খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এরই মধ্যে বাঁধের নিচের অংশের মাটি ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বাঁধটি ভেঙে গেলে বড়দল, দক্ষিণ বড়দল, পাঁচপোতা, বাইনতলা, খাজরা, লাউতাড়াসহ দুই ইউনিয়নের প্রায় ২০টি গ্রাম ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। গত বছরও এসব এলাকায় লোনা পানি ঢুকে প্রায় ১০ হাজার বিঘা জমির আমন চাষ ব্যাহত হয়েছিল। এবারও তারা একই আশঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।

এ ছাড়া নওয়াপাড়া এলাকায় এরই মধ্যে প্রায় ৫০০ ফুট বাঁধ নদীতে ধসে পড়েছে। যেকোনো সময়ে পুরো বাঁধ ভেঙে এলাকার ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের তলিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে রয়েছে এলাকাবাসী।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহমান তাযকিয়া বলেন, এসব বুধহাটা বাজার এলাকার ধস ঠেকাতে জিও ব্যাগ ড্যাম্পিং শুরু হয়েছে। বাকি এলাকাগুলোতেও খুব তাড়াতাড়ি জিও ব্যাগ ড্যাম্পিং শুরু করা হবে। 

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে


  বিষয়:   ভুল খনন  নদী  ভাঙন  ভয়  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: