শারদ উৎসবে রঙের প্রলেপে সেজে ওঠার অপেক্ষায়

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

আশ্বিনের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, নদীর চরে কাশফুলের দোল। রূপসি বাংলায় শরতের আগমনি বার্তা এখন প্রকৃতির প্রতিটি ভাঁজে। এই

2026-10-02T19:30:04+00:00
2026-10-02T19:30:04+00:00
 
  শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬,
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
শারদ উৎসবে রঙের প্রলেপে সেজে ওঠার অপেক্ষায়
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৩০ পিএম 
কারিগরদের নিপুণ হাতে দেবীর বিগ্রহ ও আনুষঙ্গিক দেব-দেবীর অবয়বে ফুটে উঠছে সূক্ষ্ম কারুকাজ। ছবি : সময়ের আলো
আশ্বিনের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, নদীর চরে কাশফুলের দোল। রূপসি বাংলায় শরতের আগমনি বার্তা এখন প্রকৃতির প্রতিটি ভাঁজে। এই আবহেই উত্তরবঙ্গের নদ-নদীবেষ্টিত জনপদ গাইবান্ধায় শুরু হয়েছে উৎসবের দিন গণনা। এবার জেলার সাতটি উপজেলায় ৬১৯টি মন্দির ও মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হবে শারদীয় দুর্গোৎসব।

মণ্ডপে মণ্ডপে এখন প্রতিমা গড়ার শেষ পর্ব চলছে। মাটির প্রাথমিক রূপদানের কাজ শেষ হয়েছে। এখন কারিগরদের নিপুণ হাতে দেবীর বিগ্রহ ও আনুষঙ্গিক দেব-দেবীর অবয়বে ফুটে উঠছে সূক্ষ্ম কারুকাজ। বাকি শুধু রঙের নিখুঁত প্রলেপ আর তুলির শেষ আঁচড়, যা প্রতিমায় প্রাণ সঞ্চার করবে।

সনাতনী পঞ্জিকা অনুযায়ী, আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হবে। ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হবে দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এই সর্বজনীন উৎসবের যবনিকা টানা হবে।

উৎসবকে সামনে রেখে গাইবান্ধার মৃৎশিল্পীরা মন্দির ও মণ্ডপগুলোতে দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। শহরের ব্রিজ রোড সংলগ্ন এলাকা, ঐতিহ্যবাহী কালীবাড়ি মন্দির প্রাঙ্গণ এবং বিভিন্ন উপজেলার মন্দির ও মণ্ডপগুলোতে শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় রূপ পাচ্ছে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুরের মৃন্ময়ী প্রতিমা। কাদা, খড় ও বাঁশের কাঠামো শুকিয়ে আসার পর এখন চলছে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিখুঁত করার কাজ। একই সঙ্গে চলছে শাড়ি ও অলংকার পরানোর প্রস্তুতি।


তবে প্রতিমা গড়ার এই লোকশিল্পের আড়ালে রয়েছে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। সাম্প্রতিক সময়ে খড়, বাঁশ, প্রতিমার বিশেষ কাদামাটি, রং, সুতা ও দেবীর কৃত্রিম পোশাকের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে। এতে শিল্পীদের লাভের হিসাব ওলটপালট হয়ে গেছে। কারিগরদের ভাষ্য, উপকরণের খরচ যে হারে বেড়েছে, পূজা কমিটির পক্ষ থেকে প্রতিমা তৈরির পারিশ্রমিক সে হারে বাড়েনি। ফলে মৌসুমি এই আয়ের ওপর ভরসা করে সারা বছরের সংসার চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। তবু বংশপরম্পরায় পাওয়া ঐতিহ্য আর ধর্মীয় অনুভূতির টানেই প্রতি বছর এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখছেন তাঁরা।

জেলার সাতটি উপজেলার ভৌগোলিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যের ছাপ পড়েছে পূজামণ্ডপের সংখ্যায়ও। বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ গাইবান্ধা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সুজন প্রসাদ জানান, জনসংখ্যা, প্রাচীন ঐতিহ্য ও সামাজিক উদ্যমের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি উপজেলার পূজার পরিধি নির্ধারিত হয়েছে।

সংখ্যার দিক থেকে এগিয়ে গোবিন্দগঞ্জ, যেখানে প্রায় ১৩৪টি মণ্ডপে পূজা হবে। প্রাচীন বর্ধনকুঠি ও বাসুদেব মন্দির এলাকাকে ঘিরে এখানে বিস্তৃত আয়োজন দেখা যায়। এর পরেই তিস্তা নদীর অববাহিকায় প্রাচীন জনপদ সুন্দরগঞ্জে প্রায় ১৩১টি মণ্ডপে পূজা হবে। সাদুল্লাপুর, যেখানে প্রায় ১১২টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন হবে। নলডাঙ্গার জমিদারবাড়ি ঘিরে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ পূজা এই উপজেলার বৈশিষ্ট্য। জেলা সদরে প্রায় ১০৭টি মণ্ডপ রয়েছে। ব্রিজ রোড, ডেভিড কোম্পানি পাড়া, মধ্যপাড়া ও ভি-এইড রোড কালীবাড়ি কেন্দ্রিক বৃহৎ আয়োজনই এখানকার প্রধান আকর্ষণ। ঐতিহ্যবাহী ভরতখালী কাষ্ঠ কালী মন্দিরকে ঘিরে সাঘাটায় মণ্ডপ প্রায় ৬২টি। পলাশবাড়ীতে প্রায় ৫৬টি মণ্ডপ, যার কেন্দ্রে রয়েছে স্থানীয় কালী মন্দির ও বাণিজ্যিক এলাকা। ব্রহ্মপুত্রের তীরের চরাঞ্চলীয় উপজেলা ফুলছড়িতে প্রায় ১৭টি মণ্ডপে গ্রামীণ আবহে হবে উৎসব।

গাইবান্ধার দুর্গোৎসবের অন্যতম শক্তি এর লোকজ ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য। এ অঞ্চলের পূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, সামাজিক মেলবন্ধনের এক ঐতিহাসিক দলিলও বটে।

সাঘাটার ভরতখালী কাষ্ঠ কালী মন্দির এ অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র তীর্থস্থান। এর নির্মাণশৈলী ও ঐতিহ্য আনুমানিক দুইশ বছরের পুরোনো বলে ধরা হয়। পূজার দিনগুলোয় দূর-দূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীদের ভিড়ে মন্দির প্রাঙ্গণ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।


সাদুল্লাপুরের নলডাঙ্গা সর্বজনীন দুর্গা ও কালী মন্দির বহন করছে স্থানীয় সামন্তযুগের ইতিহাস। প্রাচীন জমিদারবাড়ির ভগ্নাবশেষের ছায়ায় আয়োজিত এই পূজা প্রতিবছর গ্রামীণ জনপদের সামাজিক সম্প্রীতিকে নতুন করে বাঁধে। গোবিন্দগঞ্জের ইতিহাসখ্যাত বর্ধন কুঠিতে ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত বাসুদেব মন্দির চত্বরে রাজা রামপালের সময় থেকে চলে আসা পূজার ঐতিহ্য আজও স্থানীয় সনাতনী সম্প্রদায়ের কাছে গর্বের বিষয়।

জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রের ব্রিজ রোড কালীবাড়ি মন্দির, ভি-এইড রোড কালীবাড়ি প্রাঙ্গণ, মধ্যপাড়া, ডেভিড কোম্পানি পাড়ার মণ্ডপগুলো পূজার সময় বদলে যায় আলোকসজ্জার নগরীতে। ষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে চারপাশ।

উৎসব নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘ্ন রাখতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সমন্বিত নিরাপত্তা কৌশল নিয়েছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে বিশেষ মতবিনিময় সভা হয়। পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দীনের সভাপতিত্বে সভায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। জেলার সাত উপজেলার পূজা উদ্‌যাপন কমিটির প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি মণ্ডপে সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য সিসিটিভি বা আইপি ক্যামেরা বসানো বাধ্যতামূলক। পূজা কমিটির স্বেচ্ছাসেবকদের দৃশ্যমান ছবিসহ পরিচয়পত্র ব্যবহার করতে হবে। দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা প্রবেশ ও বাহির পথ রাখা হবে। অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি এড়াতে মণ্ডপে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ক্ষেত্রে বিকল্প জেনারেটর সংযোগ রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে যাতে সম্প্রীতি বিনষ্ট না হয়, সে জন্য পুলিশের বিশেষ সাইবার মনিটরিং সেল সার্বক্ষণিক নজরদারি করবে। মাঠপর্যায়ে পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের পাশাপাশি এলিট ফোর্স স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-এসআরবি’র টহল দল সড়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সক্রিয় থাকবে। এ ছাড়া স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ছাত্র-জনতাকে যুক্ত করে প্রতিটি মণ্ডপ এলাকায় সামাজিক মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাতে প্রতিমা গড়ার সময় থেকে বিসর্জন পর্যন্ত নিরাপত্তাবলয় অটুট থাকে।

শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, গাইবান্ধার স্থানীয় অর্থনীতি ও লোকসংস্কৃতিতেও নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। মৃৎশিল্পীদের পাশাপাশি ঢাকি, ডেকোরেটর, আলোকসজ্জা ব্যবসায়ী ও স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের জন্য এই সময় কর্মসংস্থানের বড়ো সুযোগ তৈরি হয়।

প্রকৃতির শারদীয় সৌন্দর্য আর মানুষের আতিথেয়তার মধ্যে গাইবান্ধার ৬১৯টি মণ্ডপ এখন অপেক্ষায় আছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের, যখন দেবীর বরদা রূপ দেখতে ভিড় জমাবে হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   শারদ  উৎসব  রঙ  প্রলেপ  শারদ উৎসব  রঙের প্রলেপ  সেজে ওঠার অপেক্ষা  সময়ের আলো  গাইবান্ধা  রংপুর 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: