সবুজে ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবার শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাসের দৃষ্টান্ত হিসেবেও দেশের সামনে নতুন পরিচয় তৈরি করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়টি উদ্যোগ নিলে সরকারিভাবে একে দেশের প্রথম সম্পূর্ণ প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শেখ ফরিদুল ইসলাম।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আয়োজিত ‘সাসটেইনেবল প্লাস্টিক ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্র্যাকটিসেস ইন জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি’ শীর্ষক টেকসই প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ক্যাম্পেইনের মূল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যদি শুরু করতে পারে, তবে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিতে পারি যে জাহাঙ্গীরনগরই দেশের প্রথম প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস। এটি সারা দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি নতুন মাইলফলক হবে।
জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনআইডিও) ও পরিবেশ অধিদফতরের (ডিওই) যৌথ উদ্যোগে এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলার উদ্যোগকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কর্মসূচি হিসেবে না দেখে জাতীয় পর্যায়ের একটি মডেল হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, শিক্ষার্থী ও তরুণদের নেতৃত্বে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে পরিবেশ রক্ষায় ছোট ছোট ক্যাম্পেইন পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি।
শেখ ফরিদুল ইসলামের ভাষায়, তরুণদের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা যখন গ্রামে বা নিজ এলাকায় যান, তখন পরিবেশ রক্ষায় ছোট ছোট ক্যাম্পেইন পরিচালনা করুন।
মন্ত্রণালয়ের গত ছয় মাসের কার্যক্রম তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, এ সময়ে দখল হয়ে যাওয়া দুই হাজার ৩০০ একরের বেশি বনভূমি উদ্ধার করে সেখানে বনায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৫৪ শতাংশের বেশি গাছ লাগানোর কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
তিনি জানান, চলতি বছর সরকারি তালিকার আওতায় প্রায় দুই কোটি ৮৪ লাখ গাছ রোপণ করা হয়েছে। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে লাগানো গাছ এ হিসাবের বাইরে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ২৫ কোটি গাছ লাগানো।
উপকূলীয় বনায়ন নিয়েও পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। আগামী ডিসেম্বরে উপকূলের চার হাজার ৪০০ একর এলাকায় আরও দুই কোটি কেওড়া গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। এ জন্য জায়গা ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বনায়নকে জলবায়ু অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, গাছ লাগানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কার্বন ক্রেডিট অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট ফর্মুলা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। দেশের বনায়ন কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায়ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ বছরে সুন্দরবনে ২৭ বার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত কঠোর গাইডলাইন ও বন বিভাগের সতর্কতার কারণে সেখানে কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটেনি।
সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় ভবিষ্যতে প্লাস্টিক ও বোতলজাত পানি নিয়ে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার বিষয়েও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বর্জ্যকে সমস্যা হিসেবে না দেখে সম্পদে পরিণত করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। উদাহরণ হিসেবে কক্সবাজারের ‘ওয়েস্ট টু রিসোর্স’ প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেখানে প্লাস্টিক ও পলিথিন পুনর্ব্যবহার করে কাঠের বিকল্প তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি পচনশীল হোটেল-বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে প্রতি কেজি ১০ টাকা দরে জৈব সার তৈরি করে কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে।
পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ রোধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের ফোর আর—রিজেক্ট, রিডিউস, রিসাইকেল, রিইউজ—নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
কাঁচাবাজার ও দৈনন্দিন কাজে সিঙ্গেল-ইউজ পলিথিনের পরিবর্তে বায়োডিগ্রেডেবল বা পচনশীল ব্যাগ ব্যবহারের ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে উৎপাদকের বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব নিশ্চিত করতে এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর)-সংক্রান্ত নিয়ম গেজেট আকারে জারি করা হয়েছে বলেও জানান। বুড়িগঙ্গা ও গাজীপুরের বিভিন্ন খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধেও কঠোর নজরদারি চলছে বলে জানান তিনি। কর্মকর্তাদের শুধু কাগজে-কলমে প্রতিবেদন না দিয়ে বাস্তবে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের পরিবেশগত সমস্যার সমাধানেও আশ্বাস দেন প্রতিমন্ত্রী। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নীরব এলাকা ঘোষণার উদ্যোগ এবং ক্যাম্পাসের বর্জ্য অপসারণে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতার বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য, পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান। সমাপনী বক্তব্যে তিনি পরিবেশবান্ধব ও প্লাস্টিকমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
কর্মশালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), উপ-উপাচার্য (শিক্ষা), কোষাধ্যক্ষ, ইউএনআইডিও বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা, জাকসু সদস্যসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
সবুজের জন্য পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবার প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাসের নতুন পরিচয় পেলে তা শুধু জাবির জন্য নয়, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও হতে পারে একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।
সময়ের আলো/জোই