স্ত্রীদের পরামর্শ নেওয়াকে অনেকে দুর্বলতা মনে করেন। অনেক স্বামী মনে করেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তার; আর স্ত্রীর কাজ তা মেনে চলা। তবে নবীজির সিরাত ও জীবনী বলে ভিন্ন কথা। নবীজি (সা.) ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত দূত। তাঁর কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি আসত। তবুও তিনি তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। তাঁদের কথা শুনতেন। প্রয়োজন হলে তাঁদের মতামত গ্রহণ করতেন। হুদায়বিয়ার ঘটনা এর সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
হুদায়বিয়ার ঘটনা থেকে শিক্ষা
ষষ্ঠ হিজরিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রায় ১৪০০ সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে উমরাহর উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে রওনা হন। কুরাইশরা মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশে বাধা দেয়। দীর্ঘ আলোচনার পর হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পন্ন হয়। চুক্তির কিছু শর্ত সাহাবিদের কাছে কঠিন মনে হয়েছিল। তাঁরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। চুক্তি শেষ হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের বললেন, ‘তোমরা ওঠো, কুরবানি করো এবং মাথা মুণ্ডন করো।’ কিন্তু সাহাবিদের কেউ সঙ্গে সঙ্গে উঠলেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনবার নির্দেশ দিলেন। তবু কেউ এগিয়ে এলেন না। তিনি অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামা (রা.)-এর কাছে গেলেন এবং তাঁকে পুরো পরিস্থিতি বললেন। উম্মে সালামা (রা.) বললেন, ‘আপনি বাইরে গিয়ে কারও সঙ্গে কথা না বলে নিজের কুরবানির পশু জবাই করুন এবং নাপিতকে ডেকে মাথা মুণ্ডিয়ে নিন।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করলেন। তিনি বাইরে গিয়ে নিজের কুরবানির পশু জবাই করলেন ও মাথা মুণ্ডিয়ে নিলেন। সাহাবিরা যখন তাঁকে এভাবে দেখলেন, তখন তাঁরাও উঠে দাঁড়ালেন, কুরবানি করলেন এবং মাথা মুণ্ডালেন। (সহিহ বুখারি: ২৭৩১-২৭৩২)। একজন স্ত্রীর পরামর্শ কীভাবে একটি অচল পরিস্থিতির সমাধান করল, এটি তার অসাধারণ উদাহরণ।
পরামর্শ গ্রহণ মানে কর্তৃত্ব হারানো নয়
রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মে সালামা (রা.)-এর পরামর্শ গ্রহণ করলেন, কিন্তু তাঁর নেতৃত্ব এতে দুর্বল হয়নি; বরং তাঁর দূরদর্শিতা আরও প্রকাশ পেয়েছে। একজন নেতা সবকিছু জানবেন, এমন নয়। অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বিভিন্ন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। পরিবারেও একই কথা প্রযোজ্য। স্বামী-স্ত্রী দুজনের অভিজ্ঞতা এক নয়। একজন যে বিষয়টি এক দৃষ্টিতে দেখছেন, অন্যজন হয়তো ভিন্ন একটি দিক দেখতে পারেন। তাই পরামর্শ গ্রহণ করা মর্যাদা কমায় না, এটি পরিপক্বতার পরিচয়।
স্ত্রীর কথা শোনা মানে তার সঙ্গে একশত ভাগ একমত হওয়া নয়। পরামর্শ গ্রহণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- কাউকে মন দিয়ে শোনা মানেই তার প্রতিটি কথা বিনাশর্তে মেনে নেওয়া নয়, বরং কথা শোনা একটি সম্মান। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গেও পরামর্শ করতেন, তাঁদের মতামত শুনতেন এবং তারপর সিদ্ধান্ত নিতেন। স্ত্রীর ক্ষেত্রেও তিনি একই সৌজন্য দেখিয়েছেন। এতে একটি সুস্থ দাম্পত্য সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে স্বামী জানেন ‘আমি আমার কথা বলতে পারি’এবং স্ত্রীও জানেন ‘আমার কথার মূল্যায়ন আছে’।
নবীজির স্ত্রীর পরামর্শের হেকমত
হুদায়বিয়ার পরিস্থিতিতে উম্মে সালামা (রা.) আবেগের বাইরে গিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনা করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, সাহাবিরা মানসিকভাবে আহত এবং তাঁদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আশা করা কঠিন। তাই তিনি কেবল মুখের কথায় তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা না করে একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করার পরামর্শ দিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে কাজটি শুরু করলে সাহাবিরাও তাঁকে অনুসরণ করবেন, ঠিক সেটাই হয়েছিল। এখানে সংকট ব্যবস্থাপনার একটি দারুণ শিক্ষা রয়েছে; অনেক সময় দীর্ঘ বক্তব্যের চেয়ে একটি কার্যকর পদক্ষেপ বেশি ফল দেয়।
স্ত্রীর বুদ্ধিমত্তাকে স্বীকৃতি দেওয়া
নারীর পরামর্শকে অনেক সমাজে আবেগনির্ভর বলে অবহেলা করা হয়। অথচ সিরাতে নববী এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখায়। উম্মে সালামা (রা.) ছিলেন একজন জ্ঞানী ও বিচক্ষণ নারী। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাও অত্যন্ত উচ্চমানের। নারী শুধু সংসারের সদস্য নন, তিনি এর গভীর পর্যবেক্ষকও। বাড়ির মানুষগুলোর আচরণ তিনি কাছ থেকে দেখেন এবং সম্পর্কের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো অনেক সময় সবার আগে বুঝতে পারেন। তাই তার অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেওয়া উচিত।
দাম্পত্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি
একটি পরিবারে প্রতিটি সিদ্ধান্ত একা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সন্তানের শিক্ষা, বাড়ি পরিবর্তন, আর্থিক পরিকল্পনা, আত্মীয়তার সম্পর্ক, সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা সংসারের বড় কোনো পরিবর্তন- এসব বিষয়ে পারস্পরিক আলোচনা পরিবারকে স্থিতিশীল করে। একজন বলবেন, অন্যজন শুনবেন, তারপর দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নেবেন। এতে যেমন সিদ্ধান্তের দায় ভাগ হয়ে যায়, তেমনি সম্পর্কের দূরত্বও কমে আসে।
পরামর্শের জন্য যোগ্যতাও প্রয়োজন
পরামর্শ নেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সঠিক মানুষের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়াও জরুরি। যিনি বিষয়টি বোঝেন, আবেগের সময়ও যিনি স্থির থাকতে পারেন এবং যিনি আপনার সত্যিকারের ভালো চান, তার মতামতই সবচেয়ে নিরাপদ। উম্মে সালামা (রা.)-এর পরামর্শের ক্ষেত্রে এই গুণগুলোই নিখুঁতভাবে প্রকাশ পেয়েছিল।
বর্তমানে অনেক দাম্পত্য সমস্যার শুরু হয় একটি ছোট্ট জেদ থেকে- ‘আমার কথাই শুনতে হবে!’ স্বামী চান স্ত্রী তার সিদ্ধান্ত নির্বিচারে মেনে নিক, আর স্ত্রী চান স্বামী তার অনুভূতি বুঝতে চেষ্টা করুক। দুজনেই কথা বলেন, কিন্তু কেউ কাউকে শোনেন না। ফলে মতবিরোধ ধীরে ধীরে অভিমানে পরিণত হয় এবং দূরত্ব তৈরি করে সম্পর্ককে দুর্বল করে তোলে।
পক্ষান্তরে, সিরাতে নববী আমাদের অন্য একটি পথ দেখায় : কথা বলুন, শুনুন, বোঝার চেষ্টা করুন এবং প্রয়োজনে নিজের অবস্থান বা সিদ্ধান্ত বদলান। নিজের মত পরিবর্তন করলে ব্যক্তিত্ব বা মর্যাদা কমে না, বরং সম্পর্কের প্রতি আপনার আন্তরিকতা ও গুরুত্বই প্রকাশিত হয়।
সময়ের আলো/মহু