ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মেঘনা নদীর তীর ভাঙতে থাকায় ভাঙনে নিঃস্ব হওয়ার তীব্র আতঙ্কে দিন পার করছে বহু পরিবার। সম্প্রতি উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের পালপাড়া, পানিশ্বর, শাখাইতি এবং শোরবাড়ি গ্রামে মেঘনা নদীর তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।
এদিকে ভাঙন ঠেকাতে আপাতত জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আকাশ দত্ত বলেন, পানিশ্বর এলাকায় নদীর ভাঙন রোধে ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৯ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।
এ ছাড়া পালপাড়া থেকে শোরবাড়ি পর্যন্ত ১ দশমিক ৩৫০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য ৬০ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে আগামী শুষ্ক মৌসুমে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আকাশ দত্ত।
এ প্রসঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, গ্রামগুলো রক্ষায় তাৎক্ষণিকভাবে জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ আমার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। এ বিষয়ে গত মার্চ মাসে পানি সম্পদমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। বাঁধ নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত তার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে পানিশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তৌহিদ মিয়া বলেন, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙন চললেও স্থায়ীভাবে তা রোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। গ্রামগুলো রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান পানিশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তৌহিদ মিয়া।
সরেজমিন কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। আলাপকালে তারা জানান, গত চার দশকে নদীভাঙনে পালপাড়া, পানিশ্বর, শাখাইতি এবং শোরবাড়ি— এই চার গ্রামের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিগত ৯-১০ বছরে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। শুধু গত চার বছরে শোরবাড়ি গ্রামের ১০টি, পানিশ্বর গ্রামের পাঁচটি এবং শাখাইতি গ্রামের ১৪টি চাতাল নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
এতে সহস্রাধিক চাতাল শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। একই সময়ে অর্ধশতাধিক পরিবার পুরোপুরি ভিটেছাড়া হয়েছে এবং শতাধিক পরিবার আংশিকভাবে ভাঙনের শিকার হয়েছে।
কথা হয় পালপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ধীরেন্দ্র পালের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, তার বাবার আমলে তিন কানি জমিতে তাদের বসতবাড়ি ছিল। বর্তমানে এখন সেখানে মাত্র তিন শতক জমি রয়েছে। বাকি সব জমি নদীর পেটে গেছে। নদী ভাঙনের কারণে গত ৪০-৪৫ বছরে এই এলাকার ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবার গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। বর্তমানে মাত্র ৩০-৩৫টি পরিবার সেখানে বসবাস করছে।
শাখাইতি গ্রামের বাসিন্দারা জানান, গত তিন-চার বছরে নদীভাঙনে প্রায় ৩০টি চাতাল, একটি মসজিদ, মাজার, কবরস্থান, কৃষিজমি ও বহু বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে। আরও বেশ কিছু স্থাপনা ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভাঙন ঠেকানো না গেলে পানিশ্বর বাজার, পানিশ্বর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শাখাইতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শোরবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও হুমকির মুখে পড়বে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা