গাইবান্ধায় বীজতলা নষ্ট, বিপাকে আমন চাষিরা

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

সারাদেশ

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর হাটে সকাল থেকেই জমজমাট বেচাকেনা। তবে, এই ব্যস্ততার পেছনে লুকিয়ে আছে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। স্বাভাবিক সময়ে যে দামে ধানের

2026-08-16T16:08:54+00:00
2026-08-16T16:11:00+00:00
 
  রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬,
১ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
গাইবান্ধায় বীজতলা নষ্ট, বিপাকে আমন চাষিরা
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: রোববার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ৪:০৮ পিএম  আপডেট: ১৬.০৮.২০২৬ ৪:১১ পিএম
আমন ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত কৃষক। ছবি : সময়ের আলো
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর হাটে সকাল থেকেই জমজমাট বেচাকেনা। তবে, এই ব্যস্ততার পেছনে লুকিয়ে আছে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। স্বাভাবিক সময়ে যে দামে ধানের চারা বিক্রি হয়, এবার তার প্রায় দ্বিগুণ গুনতে হচ্ছে ক্রেতা কৃষকদের। হাটের এক কোণে দাঁড়িয়ে দরদাম করছিলেন এক প্রৌঢ় কৃষক। হাতে গোনা কয়েকটা নোট বের করে বারবার গুনছিলেন। জিজ্ঞেস করতেই বললেন নিজের কষ্টের কথা। ১০ শতক জমিতে যত্ন করে বীজতলা তৈরি করেছিলেন তিনি, কিন্তু টানা বৃষ্টির পানি সেই বীজতলা তলিয়ে দিয়েছে। চারাগুলো পচে নষ্ট হয়ে গেছে চোখের সামনেই। এখন ৩ বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণের জন্য বাধ্য হয়ে চড়া দামেই চারা কিনতে হচ্ছে তাকে।

সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের হবিবুল্লাপুর গ্রামের এই বর্গাচাষির নাম রাঙ্গা মোল্লা। ৭৫০ টাকা দরে ধানের চারা কিনতে তার খরচ হয়েছে সাড়ে ৭ হাজার টাকা, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় যা প্রায় দ্বিগুণ। এর ওপর ইজারাদারের লোকজন আদায় করেছে আরও ২০০ টাকা টোল। এখানেই শেষ নয়, চারা বাড়ি নেওয়ার ভ্যানভাড়া, জমি হাল-চাষের খরচ, রোপণের জন্য শ্রমিকের মজুরি, সার-কীটনাশকের দাম এবং নিড়ানির খরচ মিলিয়ে এবার উৎপাদন ব্যয় আকাশছোঁয়া হয়ে দাঁড়াবে। রাঙ্গা মোল্লার শঙ্কা, আমন ধান বিক্রি করে এই খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়বে।

সাদুল্লাপুর হাটে চলছে আমন ধানের চারা বেচাকেনা। ছবি : সময়ের আলো

সাদুল্লাপুর হাটে চলছে আমন ধানের চারা বেচাকেনা। ছবি : সময়ের আলো


শুধু রাঙ্গা মোল্লা নন, তার মতো শত শত কৃষকের গল্প এখন প্রায় একইরকম। সাম্প্রতিক টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি ও উজানের ঢলে গাইবান্ধা জেলাজুড়ে আমন ধানের বীজতলা পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে, চারার চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় জেলার হাট-বাজারগুলোতে দামও উঠেছে চড়া। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের এখন বিভিন্ন হাট থেকে দ্বিগুণ দামে চারা সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এই বাড়তি ব্যয়ই এখন তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ।

জেলায় আমন ধান রোপণের কাজ শুরু হয় শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে, চলে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে গাইবান্ধায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ১২০ হেক্টর জমি। এই বিশাল আবাদের জন্য ৭ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে তৈরি করা হয়েছিল আমনের বীজতলা।

কিন্তু টানা বৃষ্টিতে এর মধ্যে ১৩২ হেক্টর বীজতলা পানিতে তলিয়ে যায়, যার মধ্যে সাড়ে ৩৩ হেক্টর সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে বলে সরকারি হিসাবে উঠে এসেছে। তবে মাঠপর্যায়ে ঘুরে দেখা গেছে, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।


সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে আষাঢ় মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বীজতলা তৈরি করেন কৃষকেরা। গত জুলাই মাসে টানা ২ সপ্তাহের বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। নদ-নদীর পানিও বাড়তে শুরু করে একই সময়ে। ফলে, জেলার নিম্নাঞ্চলের প্রায় সব বীজতলা তলিয়ে যায় পানির নিচে। যেসব এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো, সেখানে বৃষ্টি থামার এক-দুই দিনের মধ্যেই পানি নেমে গেছে। কিন্তু বাকি এলাকাগুলোতে দীর্ঘ সময় পানির নিচে থেকে বীজতলা পুরোপুরি পচে নষ্ট হয়ে গেছে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, জেলার পানি নিষ্কাশনের অধিকাংশ খাল-বিল এখন প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে। এসব খাল-বিল ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কোথাও আবার উন্মুক্ত সরকারি খাল-বিলে পানি প্রবাহ বন্ধ করে চলছে মাছ চাষ কিংবা ফসল আবাদ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সড়ক নির্মাণের সময় পানি চলাচলের জন্য তৈরি ব্রীজ-কালভার্টের মুখ বন্ধ করে দেওয়া নানা স্থাপনা। এসব কারণেই বৃষ্টি বা বন্যার পানি সময়মতো নামতে পারছে না বলে মনে করছেন কৃষকেরা, যার মাশুল গুনতে হচ্ছে ফসলের মাঠে।

পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাথপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল সোবহান মিয়া এবার প্রায় ৮ বিঘা জমিতে আমন চাষের পরিকল্পনা নিয়ে ২৫ শতক জমিতে বীজতলা তৈরি করেছিলেন। ২০-২২ দিন বয়সী সেই চারা টানা এক সপ্তাহ পানির নিচে থেকে একেবারে পচে যায়। বাধ্য হয়ে এখন তিনি চড়া দামে হাট থেকে চারা কিনে জমিতে রোপণ করছেন।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পাঁচগাছি শান্তিরাম গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ওসমান গনির কণ্ঠেও হতাশা স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘সরকারিভাবে প্রণোদনার ব্যবস্থা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পক্ষে এ বছর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।’ 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গাইবান্ধা কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) রোস্তম আলী জানিয়েছেন, ক্ষতির বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আগামী রবি মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত এসব কৃষককে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রণোদনার বীজ ও সার দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

সময়ের আলো/মহু



  বিষয়:   গাইবান্ধা  বীজতলা  নষ্ট  আমন  চাষি  কৃষক  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: