ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতার নিউ মার্কেট সংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ৯ জন নিহতের পেছনে আগুনের শিখা নয়, বরং হোটেলের অপরিকল্পিত গাঠনিক বিন্যাস, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের অভাব ও নিরাপত্তা কাঠামোর চরম ব্যর্থতাই মূল কারণ বলে জানিয়েছে কলকাতা পুলিশ। অগ্নিকাণ্ডে নিহতরা আগুনে পুড়ে ছাই হননি, তারা মূলত বিষাক্ত ধোঁয়া ও গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন বলে মন্তব্য করেছেন পার্ক স্ট্রিট থানার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সন্ধ্যায় নিউ মার্কেটের যমুনা ব্যাংকোয়েটসে হোটেল ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি পর্যালোচনা বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই পুলিশ কর্মকর্তা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
অগ্নিকাণ্ডের পরের ভয়াবহ পরিবেশের বিবরণ দিতে গিয়ে ওই কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আগুন লাগার পর সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে তিনি হোটেলের ভেতরে প্রবেশ করেন। ততক্ষণে দমকলকর্মীরা ধোঁয়া বের করে দিয়েছিলেন, তা সত্ত্বেও ভেতরের বাতাসে প্রচণ্ড বিষাক্ত গ্যাস জমে ছিল। তিনি বলেন, "হোটেলটি মূলত একটি বড় হলরুম ছিল। সেই হলরুমকে কাঠ বা বোর্ডের পার্টিশন দিয়ে মাঝখানে একটি মাত্র সরু গলি বানিয়ে দুই পাশে ছোট ছোট কক্ষ ও বাথরুম তৈরি করা হয়েছিল। বের হওয়ার বা ঢোকার রাস্তা ছিল একটাই।"
কক্ষগুলোর গাঠনিক ত্রুটি তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, "ঘরের ভেতরে ডেকোরেশন থাকলেও ধোঁয়া বা বাতাস চলাচলের জন্য একটি ভেন্টিলেটর বা জানালা পর্যন্ত রাখা হয়নি। এমনকি বাথরুমে কোনো এক্সজস্ট ফ্যানও ছিল না। ফলে এসি বন্ধ হয়ে আগুন লাগার পর তৈরি হওয়া কার্বন ও বিষাক্ত গ্যাস রুমগুলোতে আটকে যায়। সেই বিষাক্ত গ্যাসে দমবন্ধ হয়েই ৯ জন নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান, যার মধ্যে একটি ছোট শিশুও ছিল।"
হোটেল মালিকদের সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, "যেসব সাধারণ মানুষ ১ হাজার বা ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে এখানে থাকতে আসেন, তারা বিত্তশালী নন। এক দেশ থেকে অন্য দেশে এসে তারা আপনাদের ওপর ভরসা করেন। কিন্তু শিখা ইনে এসে তাদের মৃত্যুফাঁদে পড়তে হলো। এই ৯টি প্রাণ চলে যাওয়া কোনো ছোট ঘটনা নয়, এটি এখন আন্তর্জাতিক সংবাদের শিরোনাম হয়েছে।"
উক্ত বৈঠকে উপস্থিত পার্ক স্ট্রিট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অমিত চট্টোপাধ্যায় ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মহসিন কামালসহ অন্য কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে হোটেল মালিকদের বেশ কিছু কঠোর নির্দেশ দেন। নির্দেশনাসমূহের মধ্যে রয়েছে:
প্রতিটি হোটেলের ফায়ার লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স ও পুলিশ লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক করা।নিয়মিত নিজস্ব খরচে ফায়ার অডিট নিশ্চিত করা।রাতে হোটেলের মূল গেট পুরোপুরি বন্ধ না রাখা এবং অন্তত একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীকে সার্বক্ষণিক জাগ্রত রাখা।অতিথি রেজিস্টারে সঠিক তথ্য এবং অনলাইন ডেটা ফর্ম জমা দেওয়া।জরুরি নির্গমন পথ বা এমার্জেন্সি এক্সিটের সামনে যেকোনো ধরনের গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধ করা।প্রতিটি কক্ষে অ্যালার্ম ও এমার্জেন্সি এক্সিট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এসব নির্দেশনা অবিলম্বে না মানলে সংশ্লিষ্ট হোটেলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সময়ের আলো/টিকে