ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এটিকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে প্রায় পাঁচ দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরান নতুন করে এমন চাপ কতটা সামলাতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রায় ছয় মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমে আসছে। একই সময়ে তেহরানকে চাপে ফেলতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে আরও কঠোর করার পথে হাঁটছে ট্রাম্প প্রশাসন।
ট্রাম্পের দাবি, ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে বাধ্য করতেই এই অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হবে।
তবে নতুন পদক্ষেপের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করেনি ওয়াশিংটন। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বৃহস্পতিবার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।
তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা অব্যাহত রাখলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ও সরকার তাদের বিরুদ্ধে ‘পূর্ণ শক্তি’ প্রয়োগ করবে। চীন ও ভারত ইরানের তেলের বড় ক্রেতা হওয়ায় নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় তাদেরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক দশক ধরেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দেশটির জ্বালানি, আর্থিক ও পরিবহন খাতের প্রায় সবই ইতোমধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায়।
ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা, এবার সঠিক অর্থনৈতিক খাতে আঘাত হানতে পারলে তেহরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করা সম্ভব হবে। তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ সতর্ক করে বলছেন, নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সামরিক চাপ বাড়ালে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপে যুক্ত থাকা বিশেষজ্ঞ রিচার্ড গোল্ডবার্গের মতে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা, চলমান যুদ্ধ এবং ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে মার্কিন নৌ অবরোধ— সব মিলিয়ে তেহরানের ওপর আগে না থাকা এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পরিস্থিতি এমন এক ‘অজানা পথে’ নিয়ে যাচ্ছে, যার পরিণতি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
ইরানের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে ব্যবসা করা মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারে ওয়াশিংটন। এর মাধ্যমে ইরানের অবশিষ্ট বৈদেশিক আয়ের পথ বন্ধ করার চেষ্টা করা হবে। তবে এমন পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও ইরানের তেলনির্ভর দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে গিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হয়েছিল। এবারও ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ইরান ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এদিকে ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তেহরানকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দাবি করেছেন, কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় ইরান দেখিয়েছে যে পুরোনো নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশটিকে ‘শ্বাসরোধ’ করা যাবে না।
আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষক আলী ওয়ায়েজের বলেন, সামরিক অভিযানের পাশাপাশি ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি আরও জোরদার করে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতির শিক্ষা উপেক্ষা করছে। তার ভাষ্য, নতুন অর্থনৈতিক চাপ বরং ইরানের অবস্থান আরও কঠোর করে তুলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ইরানের কাছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কষ্টের চেয়েও মার্কিন শর্ত মেনে আত্মসমর্পণ করাকে বেশি বিপজ্জনক মনে হচ্ছে। ফলে আলোচনার কোনো পথ খোলা না রেখে শুধু চাপ প্রয়োগ করলে তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
সময়ের আলো/কেএইচ