উত্তর কোরিয়ার প্রায় ১০টি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার এক দিন পরই নির্ধারিত সময়ের ছয় দিন আগেই সামরিক মহড়া শেষ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া। উত্তর কোরিয়াকে আলোচনায় ফেরানোর উদ্যোগ হিসেবে মহড়া সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, পিয়ংইয়ং জানিয়েছে— এতে তাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না।
শুক্রবার বার্ষিক ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ সামরিক মহড়া শেষ করছে দুই দেশ। এর আগে সোমবার মহড়া শুরুর ঠিক আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পেন্টাগনকে মহড়ার পরিসর ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর’ নির্দেশ দেন। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে নিজের ‘ভালো সম্পর্ক’ এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন না করার বিষয়টি এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
তবে ট্রাম্পের এই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেন উত্তর কোরিয়ার প্রভাবশালী নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং। বুধবার তিনি বলেন, মহড়ার সময়সীমা ও পরিসর কমালেই এর ‘উসকানিমূলক ও আগ্রাসী চরিত্র’ বদলে যাবে না।
এর পরদিনই সমুদ্রের দিকে প্রায় ১০টি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে উত্তর কোরিয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়াকে পিয়ংইয়ং দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাব্য আগ্রাসনের প্রস্তুতি হিসেবে দেখে আসছে। মহড়ার জবাবে ব্যবস্থা নেওয়ার আগের হুমকির ধারাবাহিকতায় এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ড জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড বা তার মিত্রদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি তৈরি হয়নি। একই সঙ্গে অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের প্রতিরক্ষায় নিজেদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে ওয়াশিংটন।
মহড়া কমিয়ে আনার পরও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে দ্রুত আলোচনার সম্ভাবনাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ২০১৯ সালে ট্রাম্প ও কিম জং উনের মধ্যে পরমাণু আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত অচল হয়ে আছে।
এরপর উত্তর কোরিয়া নিজেদের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আরও আধুনিক করেছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করেছে। গত বছর কিম জং উন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণকে আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র না সরালে তিনি আলোচনায় ফিরবেন না।
তবে কিম ইয়ো জংয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তুলনামূলক সংযত সুরও দেখা গেছে। তিনি ট্রাম্প ও তার ভাইয়ের মধ্যে ‘চমৎকার’ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া ভবিষ্যৎ আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ না করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বড় ধরনের ছাড় আদায়ের সুযোগ ধরে রাখতে চাইছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ওয়াশিংটনের কাছ থেকে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মতো ছাড় চাইতে পারে পিয়ংইয়ং। একই সঙ্গে রাশিয়াকে গোলাবারুদ ও সেনা সরবরাহের বিনিময়ে পাওয়া অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্কও উত্তর কোরিয়াকে বাড়তি কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে।
সিউলের ইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লেইফ-এরিক ইজলি মনে করেন, উত্তর কোরিয়া হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবে। তবে সেটি মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হতে পারে, যখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্প কিছুটা দুর্বল অবস্থানে থাকবেন এবং বড় কোনো পররাষ্ট্রনীতিগত সাফল্য দেখানোর প্রয়োজন অনুভব করতে পারেন।
সময়ের আলো/কেএইচ