দার্জিলিং ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে ধীরে ধীরে ছুটে চলা ঐতিহ্যবাহী টয় ট্রেন। এবার সেই রেল ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন আরেকটি আকর্ষণ। ১৪৬ বছর পূর্ণ করেছে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের সুকনা স্টেশন। এ উপলক্ষে স্টেশনটি সাজানো হয়েছে নতুনভাবে এবং চালু করা হয়েছে ঐতিহাসিক আলোকচিত্রের একটি গ্যালারি।
স্টেশনের ১৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠানের। কেক কাটার পাশাপাশি পরিবেশিত হয় নেপালি লোকনৃত্য ও সংগ। সেখানে স্থান পেয়েছে দার্জিলিংয়ের ঐতিহ্যবাহী টয় ট্রেনের বিভিন্ন সময়ের দুর্লভ ও ঐতীত। এতে রেল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্থানীয়রাও অংশ নেন।
উদ্যাপনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নতুন টয় ট্রেন ফটো গ্যালারি। নর্থইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক চেতন কুমার শ্রীবাস্তব গ্যালারিটির উদ্বোধন করেন। সেখানে স্থান পেয়েছে দার্জিলিংয়ের ঐতিহ্যবাহী টয় ট্রেনের বিভিন্ন সময়ের দুর্লভ ও ঐতিহাসিক ছবি।
ছবির সঙ্গে জানা যাবে টয় ট্রেনের ইতিহাস
গ্যালারির প্রতিটি ছবির সঙ্গে রয়েছে কিউআর কোড। দর্শনার্থীরা মোবাইল ফোন দিয়ে কোড স্ক্যান করলেই ছবিটির পেছনের ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট ট্রেন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবেন।
অর্থাৎ সুকনা স্টেশনে গিয়ে শুধু টয় ট্রেন দেখা বা ছবি তোলাই নয়, পর্যটকেরা জানতে পারবেন এই পাহাড়ি রেলপথের দীর্ঘ ইতিহাস, পুরোনো দিনের ট্রেনযাত্রা এবং সময়ের সঙ্গে এর পরিবর্তনের গল্প।
বাড়ছে পর্যটকদের আগ্রহ
দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়েতে প্রতি বছরই যাত্রীসংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছর আগের যাত্রীসংখ্যার রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক চেতন কুমার শ্রীবাস্তব।
পর্যটকদের বাড়তি আগ্রহের কারণে টয় ট্রেনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দুর্গাপূজার সময় পর্যটকের চাপ বাড়তে পারে। তাই উৎসবের মৌসুমে অতিরিক্ত ট্রেন চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
বর্তমানে দার্জিলিং থেকে ঘুম পর্যন্ত প্রতিদিন আট জোড়া জয়রাইড ট্রেন চলাচল করে। পাশাপাশি নিউ জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিংয়ের মধ্যেও সরাসরি ট্রেন রয়েছে।
১৪০ বছরের বেশি পুরোনো পাহাড়ি রেলপথ
দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে নির্মাণ করা হয় ১৮৭৯ থেকে ১৮৮১ সালের মধ্যে। প্রায় ৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথের গেজ মাত্র দুই ফুট বা ৬১০ মিলিমিটার।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রেললাইন নির্মাণ করতে গিয়ে প্রকৌশলীরা ব্যবহার করেছিলেন নানা ধরনের বাঁক, জিগজ্যাগ ও লুপ। এসব পথ পেরিয়ে ট্রেনটি নিউ জলপাইগুড়ির প্রায় ১০০ মিটার উচ্চতা থেকে দার্জিলিংয়ের প্রায় ২ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় উঠে যায়।
ট্রেনের জানালা দিয়ে যাত্রীরা উপভোগ করতে পারেন পাহাড়ি বন, সবুজ ঢাল, ছোট ছোট জনপদ আর মেঘে ঢাকা পাহাড়ের দৃশ্য। এ কারণেই টয় ট্রেনের যাত্রা দার্জিলিং ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।
ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি
দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে শুধু পর্যটনের জন্য নয়, ঐতিহাসিক ও প্রকৌশলগত গুরুত্বের কারণেও বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রেল যোগাযোগ তৈরির অনন্য প্রকৌশলগত উদাহরণ হিসেবে এই রেলপথকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছেও দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেন বেশ জনপ্রিয়। তাই পূজা বা শীতের ছুটিতে দার্জিলিং ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে সুকনা স্টেশনের নতুন গ্যালারিটি ভ্রমণতালিকায় রাখা যেতে পারে। পর্যটকের চাপ বেশি থাকায় টয় ট্রেনের টিকিট ও সময়সূচি আগেই দেখে নেওয়া ভালো।
সুকনা স্টেশনের ১৪৬ বছরের ইতিহাস আর পাহাড়ের বুক চিরে ছুটে চলা টয় ট্রেন—দার্জিলিং ভ্রমণে এবার যুক্ত হলো ইতিহাস ও নস্টালজিয়ায় ভরা নতুন এক আকর্ষণ।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ