যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘ সংকটে ইয়েমেনের লাখো মানুষ আজও খাবার ও চিকিৎসার জন্য মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে শিশুরা। জাতিসংঘের হিসাবে, দেশটিতে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২২ লাখের বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। এর মধ্যে পাঁচ লাখেরও বেশি শিশু গুরুতর অপুষ্টির শিকার।
প্রায় এক যুগ ধরে চলা সংঘাতের কারণে ইয়েমেনে ২ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে রয়েছে। আর তীব্র খাদ্যসংকটে পড়েছে প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ। অথচ ২০২৬ সালে মানবিক সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রায় ২২০ কোটি ডলারের বিপরীতে এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র এক-পঞ্চমাংশ।
এই পরিস্থিতিই সামনে এনেছে বড় একটি প্রশ্ন— ইয়েমেনে বছরের পর বছর ধরে শত শত কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক সহায়তা পাঠানো হলেও কেন শিশুরা ক্ষুধা ও অপুষ্টি থেকে মুক্তি পাচ্ছে না?
বাড়ছে শিশুদের অপুষ্টি
ইয়েমেনের বিভিন্ন বাস্তুচ্যুত মানুষের ক্যাম্প, হাসপাতাল ও পুষ্টি কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, অপুষ্টির সংকট কতটা গভীর।
হাজ্জাহ প্রদেশের আবস এলাকার একটি বাস্তুচ্যুত ক্যাম্পে বসবাস করে দুই বছরেরও কম বয়সী জিয়াদ মোহাম্মদ জালাল। যুদ্ধের কারণে তার পরিবার হারাদ জেলা থেকে পালিয়ে এখানে এসেছে। তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে জিয়াদ। ওজন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাকে।
জিয়াদের মতো অনেক শিশুই তখনই পুষ্টি কেন্দ্রে পৌঁছায়, যখন দারিদ্র্য ও বাস্তুচ্যুতির প্রভাব তাদের শরীরে মারাত্মকভাবে দেখা দিতে শুরু করে। আল-জাজিরার মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে শুধু আবস এলাকাতেই অপুষ্টির ২০০টির বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া ধালে গভর্নরেটের আল-নাসর হাসপাতালে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত ২৬৯ শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যেও পরিস্থিতির অবনতির চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে গুরুতর অপুষ্টির ঘটনা বেড়েছে।
তাইজে তীব্র অপুষ্টির প্রায় ১১,৯৮২টি, এডেনে ৭,৩৩৯টি এবং ধালে ৬,৭১০টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। মাঝারি মাত্রার অপুষ্টির ঘটনাও ছিল হাজার হাজার।
চিকিৎসা হচ্ছে, কিন্তু সংকট থেকে যাচ্ছে
ইয়েমেনের পুষ্টি কেন্দ্রগুলোতে শিশুর শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর অবস্থায় থাকা শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তুলনামূলক স্থিতিশীল রোগীদের দেওয়া হয় বিশেষ পুষ্টিকর খাবার ও পরিপূরক, পাশাপাশি নিয়মিত ওজন ও শারীরিক বৃদ্ধির ওপর নজর রাখা হয়।
মারিবের আল-সুমাইয়া ক্যাম্পের একটি সরকারি পুষ্টি ক্লিনিকে গত এক বছরে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত ৩৩ শিশু, মাঝারি মাত্রার অপুষ্টিতে আক্রান্ত ৮৫ শিশু এবং ৮৪ জন মাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার কারণে অপুষ্টির ঝুঁকি আরও বাড়ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এসব চিকিৎসা কার্যক্রমে খাবার, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করছে।
তবে একটি শিশুকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলার পরও তাকে আবার সেই একই দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকটের পরিবেশে ফিরে যেতে হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অপুষ্টির মূল কারণ দূর হচ্ছে না।
চাহিদা বাড়ছে, কমছে সহায়তা
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ মানুষের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সহায়তা প্রয়োজন। দেশটির স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর মাত্র ৫৯ শতাংশের কিছু বেশি পুরোপুরি সচল রয়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্থায়ন প্রয়োজনের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে কমছে।
২০২২ সালে ইয়েমেনের জন্য ৪২৭ কোটি ডলার প্রয়োজন হলেও পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ২২৭ কোটি ডলার। ২০২৪ সালে ২৭১ কোটি ডলারের চাহিদার বিপরীতে অর্থায়ন হয়েছিল প্রায় ১৫১ কোটি ডলার। আর ২০২৬ সালের পরিকল্পনায় প্রায় ২১৬ কোটি ডলার প্রয়োজন হলেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়েছে মাত্র ২০.৬ শতাংশ।
অর্থের এই ঘাটতির প্রভাব সরাসরি পড়ছে চিকিৎসা ও পুষ্টি কর্মসূচিতে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের বদলে জীবন রক্ষাকারী জরুরি চিকিৎসাকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) অর্থায়ন কমে যাওয়ায় তাদের সহায়তা কার্যক্রমও সংকুচিত হয়েছে। আগে যেখানে ১২২টি জেলায় কর্মসূচি চলত, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৬২টি জেলায়।
কোটি কোটি ডলার সহায়তার পরও কেন কাটছে না সংকট?
ইয়েমেনের শিশুদের দুর্দশার চিত্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তার বিপুল অর্থের হিসাব মেলাতে গিয়ে আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে।
আল-জাজিরার অনুসন্ধানে দেখা যায়, হাজ্জাহ এলাকায় নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের একটি প্রকল্পে প্রায় ১১ লাখ ডলারের বাজেট ছিল। এর মধ্যে সরাসরি প্রকল্পের লক্ষ্যভিত্তিক কার্যক্রমে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৫৩ হাজার ডলার।
অন্য একটি প্রকল্পে কর্মীদের বেতন ও ভাতা এবং গুদাম ব্যবস্থাপনার পেছনেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের হিসাব পাওয়া যায়। তবে সহায়তা পাওয়া মানুষের কেউ কেউ জানিয়েছেন, তারা প্রত্যাশিত সহায়তার তুলনায় খুব অল্পই পেয়েছেন।
মানবিক সহায়তা ও যুদ্ধকালীন অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি শুধু কত টাকা ইয়েমেনে যাচ্ছে, তা দিয়ে বিচার করলে হবে না। গুরুত্বপূর্ণ হলো— সেই অর্থ মানুষের জীবনে কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারছে।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক সহায়তা অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। কিন্তু এই সহায়তা দিয়ে যুদ্ধ থামানো, কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনা, অর্থনীতি পুনর্গঠন কিংবা সরকারি সেবা পুরোপুরি সচল করা সম্ভব নয়।
ফলে একদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কোটি কোটি ডলারের সহায়তা নিয়ে কাজ করছে, অন্যদিকে ইয়েমেনের অনেক শিশু এখনো ক্ষুধা, অপুষ্টি ও রোগের সঙ্গে লড়ছে।
তাহানির মতো কোনো শিশুর মৃত্যু তাই শুধু খাদ্যের অভাবের গল্প নয়; এটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, দারিদ্র্য, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং অপর্যাপ্ত মানবিক সহায়তার সম্মিলিত সংকটের প্রতিচ্ছবি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ