বান্দরবান সদর উপজেলার রাজবিলা ইউনিয়নের শিলক খালে রাবার ড্যামসংলগ্ন এলাকা বালুমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, রাবার ড্যাম ঘেঁষা এলাকা থেকে বালু উত্তোলন শুরু হলে খালের ভাঙন আরও তীব্র হতে পারে।
এতে বসতভিটা, কৃষিজমি, স্থানীয় সড়ক ও রাবার ড্যামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। বিশেষ করে রাবার ড্যামের কাছ থেকে বালু উত্তোলন করা হলে এর স্থায়িত্ব ও আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজবিলা নিচের পাড়ার প্রধান সড়কের দুই পাশে ৯৮টি মার্মা পরিবারের বসবাস। পাড়াটির পাশ দিয়েই বয়ে গেছে শিলক খাল। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খালের বিভিন্ন স্থান থেকে বালু উত্তোলনের কারণে বর্ষা মৌসুমে ভাঙন তীব্র হচ্ছে। ইতোমধ্যে খালের পাড় ভাঙতে ভাঙতে পাড়ার প্রধান সড়কের কাছাকাছি চলে এসেছে।
স্থানীয়দের দাবি, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে শিলক খালের ভাঙনে ১০ থেকে ১২টি বসতভিটা এবং তীরবর্তী প্রায় ১০ বিঘা আবাদি জমি বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে খালের রাবার ড্যাম সংলগ্ন এলাকায় নতুন করে বালুমহাল ইজারা দেওয়ায় রাজবিলা নিচের পাড়া, রাজবিলা উপর পাড়া ও রাজবিলা মুসলিম পাড়াসহ ছয়টি পাড়ার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
তাদের আশঙ্কা, জনবসতিপূর্ণ ওই এলাকায় বালু উত্তোলন শুরু হলে ভাঙন আরও বাড়তে পারে। এতে কৃষিজমি, বসতভিটা, স্থানীয় সড়ক, রাবার ড্যাম ও অন্যান্য অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়বে।
গত ২১ জুন জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে ঝাংকা খালের দুটি এবং শিলক খালের রাবার ড্যাম এলাকার একটি স্থানসহ মোট তিনটি এলাকায় পাঁচটি স্পট থেকে বালু উত্তোলনের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এসব স্পটে প্রায় সাত একর জায়গা থেকে বালু উত্তোলনের কথা বলা হয়।
জেলা প্রশাসনের নথি অনুযায়ী, শিলক খালের রাজবিলা নিচের পাড়া সংলগ্ন রাবার ড্যাম ব্রিজ থেকে ৩০০ ফুট বাদ দিয়ে নিচের দিকে এক হাজার ফুট পর্যন্ত তিন একর এলাকা থেকে ৫ লাখ ২২ হাজার ৭২০ ঘনফুট বালু উত্তোলনের কথা রয়েছে।
এ ছাড়া, ঝাংকা খালের ঝুরঝুরি পাড়া ব্রিজ থেকে ৩০০ ফুট বাদ দিয়ে ওপরের দিকে এক হাজার ফুট পর্যন্ত দুই একর এলাকা থেকে ২ লাখ ৬১ হাজার ৩৬০ ঘনফুট এবং রমতিয়া সড়কের উদাল বনিয়া ব্রিজের ওপর ও নিচের দিকে ৩০০ ফুট বাদ দিয়ে এক হাজার ফুট পর্যন্ত দুই একর এলাকা থেকে ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৬০০ ঘনফুট বালু উত্তোলনের কথা উল্লেখ রয়েছে।
শিলক খালের ভাঙনে জমি, আমবাগান ও বসতভিটা হারিয়েছেন ৬৫ বছর বয়সি মাসাংচিং মার্মা। তিনি বলেন, আগে রাবার ড্যাম থেকে অনেক দূরে বালু উত্তোলনের কারণেই খালের পাড় ভেঙেছে। এখন পাড়ার কাছেই বালু উত্তোলন শুরু হলে মানুষের বসতভিটা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাজবিলা ইউনিয়নে ঝাংকা ও শিলক নামে দুটি খাল রয়েছে। ঝাংকা খালের প্রস্তাবিত দুটি বালুমহালের আশপাশে জনবসতি ও কৃষিজমি তুলনামূলক কম থাকায় সেখানে বালু উত্তোলন নিয়ে তাঁদের তেমন আপত্তি নেই। তবে শিলক খালের রাবার ড্যাম সংলগ্ন স্পটটির আশপাশে ছয়টি পাড়ার প্রায় ১৫৩ হেক্টর কৃষিজমি রয়েছে। খালের তীরবর্তী এলাকায় সরাসরি বসবাস করছে প্রায় ৫০টি পরিবার।
রাজবিলা নিচের পাড়ার বাসিন্দা ক্যচিংমং মার্মা ও হ্লাচিং মং মার্মা বলেন, শিলক খালের ওপর নির্ভর করেই তাঁরা সেচ সুবিধা নিয়ে কৃষিকাজ করেন। খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ও তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ফসলি জমি, বসতভিটা ও মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
রাজবিলা মুসলিম পাড়ার ব্যবসায়ী বদিউর আলম বলেন, রাবার ড্যাম সংলগ্ন এলাকায় সরকার বালুমহাল ইজারা দেওয়ায় তাদের আপত্তি নেই। তবে খালের পাশে স্থানীয় মানুষের জমি ও বাড়িঘর রয়েছে। পাশের রাঙ্গুনিয়া এলাকায় বালু উত্তোলনের কারণে রাবার ড্যামের ব্রিজের পিলার তিন থেকে চার ফুট পর্যন্ত বেরিয়ে গেছে। এরপরও এখানে বালু উত্তোলন করা হলে সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
রাজবিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যঅংপ্রু মার্মা বলেন, রাবার ড্যাম এলাকার মানুষ অনেক আগে থেকেই এ বিষয়ে সচেতন। এ এলাকা থেকে আগে কখনো বালু উত্তোলন করতে দেওয়া হয়নি। এমনিতেই কয়েকটি স্থানে খালের পাড় ভেঙে গেছে। এখন সেখান থেকে বালু উত্তোলন করা হলে ভাঙন আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। বালু উত্তোলন করা হলে এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন— এ আশঙ্কার কথাও জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বালু উত্তোলনের স্পটটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব বলেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বালুমহাল ইজারা নিলামের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন। তবে নিলামের আগে বা পরে ইজারা প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন না।
তিনি বলেন, ঝাংকা খালের ঝুরঝুরি পাড়া ও উদাল বনিয়া এবং শিলক খালের রাবার ড্যামসংলগ্ন ব্রিজ এলাকায় বালুমহাল ঘোষিত স্থানগুলো থেকে বালু উত্তোলনের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
শিলক খালের ভাঙন রোধে রাজবিলা নিচের পাড়ার বাসিন্দাদের আবেদন পাওয়ার বিষয়টিও তিনি নিশ্চিত করেন। আবেদনটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনা ও অনুমোদন পাওয়া গেলে এলাকাটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নুর হাসান সজীব বলেন, বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এবং বালু ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১১ অনুযায়ী জেলা প্রশাসক তাঁর এখতিয়ারে বালুমহাল ইজারা দিয়েছেন। তবে বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশের ক্ষতি হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিলক খালে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বালুর প্রয়োজন রয়েছে। শিলক খালের বালুর মানও ভালো। দীর্ঘদিন ধরে এই খাল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হয়ে আসছিল। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে মাঠ পরিদর্শন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পাঁচটি স্পটে প্রায় সাত একর জায়গাকে বালুমহাল হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে এক বছরের জন্য সর্বোচ্চ ১ কোটি ৮৯ লাখ ৫ হাজার ৪০ টাকায় চনুমং মারমাকে ইজারাদার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের পর থেকেই রাবার ড্যাম সংলগ্ন স্পটটি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা। ছয়টি পাড়ার বাসিন্দাদের দাবি, তারা ওই এলাকা থেকে কোনোভাবেই বালু উত্তোলন চান না।
সময়ের আলো/এসএকে