নড়াইল সদর উপজেলার শেখহাটি ইউনিয়নে আফরা নদীর অব্যাহত ভাঙন এখন আর কেবল কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, রূপ নিয়েছে হাজারো মানুষের বাসস্থান, জীবিকা ও স্বজনদের স্মৃতি রক্ষার এক চরম মানবাধিকার সংকটে। আশ্বিন-কার্তিক মাস এলে নদীর তাণ্ডবে বিলীন হচ্ছে একের পর এক পৈতৃক ভিটা, বাগান ও ঐতিহ্যবাহী শেখহাটি বাজার।
ঐতিহ্য আর স্মৃতির শেষ চিহ্ন টুকু রক্ষায় বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বৈরাগির ঘাট থেকে তপনবাগ কাঠালিয়ার ঘাট পর্যন্ত নদীতীরে মানববন্ধনে শত শত ভুক্তভোগী মানুষ সমবেত হন।
চিত্রা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে ভৈরব নদীতে মেশা ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ জোয়ার-ভাটাপ্রবণ আফরা নদীটি বর্তমানে নড়াইল সদরের শেখহাটি ইউনিয়নের বৈরাগির ঘাট থেকে তপনবাগ কাঠালিয়ার ঘাট পর্যন্ত প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার এলাকায় তীব্র ভাঙন চালাচ্ছে। প্রায় দেড় থেকে দুই শতাধিক পরিবার তাদের শেষ সম্বল ঘরবাড়ি ও কৃষি জমি হারানোর তীব্র আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
ওই অঞ্চলের একাধিক গ্রামের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র শেখহাটি বাজারের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য হলো স্থানীয় প্রাচীন কবরস্থানটির বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়া। ভুক্তভোগীদের আকুতি, নতুন করে কেউ মারা গেলে দাফন করার মতো জায়গাটুকুও আর অবশিষ্ট নেই।
এলাকার মিজান শেখ বলেন, আমাদের বসতভিটা, বাগানের গাছপালা একের পর এক নদীতে চলে যাচ্ছে। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিলে অন্তত পৈতৃক ভিটাটুকু রক্ষা পাবে।
গৃহবধু শিরিন আক্তার বলেন, আমাদের কবরস্থান ভাঙতে ভাঙতে প্রায় পুরোটাই শেষ। এরপর কেউ মারা গেলে শেষ দাফনের জায়গাটুকুও পাব না। আশ্বিন-কার্তিক এলেই আমরা আতঙ্কে থাকি। প্রতিবছর একটু একটু করে নদী আমাদের সব গিলে খাচ্ছে।
এছাড়াও হাফিজুর রহমান সরদার, তারিকুল ইসলাম, মৃত্যুঞ্জয় ধর ও কৃষ্ণ ভট্টাচার্যসহ স্থানীয় প্রবীণরা তাদের সহায়-সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন।
ভাঙনপ্রবণ এলাকায় অবিলম্বে জিও ব্যাগ ফেলা বা অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বৈরাগির ঘাট থেকে তপনবাগ কাঠালিয়া পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ও মজবুত নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ। গৃহহীন ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (নড়াইল) নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজীত কুমার সাহা জানান, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে দ্রুত স্থানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে। জরুরি সুবিধার আওতায় পড়লে দ্রুত অস্থায়ী প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং স্থায়ী বাঁধের জন্য ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
শেখহাটিবাসীর মতে, এটি কেবল নদীতীর রক্ষার আন্দোলন নয়, বরং বাঁচা-মরার ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার সংগ্রাম। অনতিবিলম্বে সরকারি কার্যকর পদক্ষেপ না এলে পুরো ইউনিয়নটি মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
সময়ের আলো/আতা