মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরের শেষ দিকে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে আবারও বৈঠক করতে চান। তবে ওয়াশিংটনের এই আগ্রহে এখনো তেমন সাড়া দেয়নি পিয়ংইয়ং। বরং উত্তর কোরিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে, বৈঠক হলেও এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন কিছু শর্ত মানতে হতে পারে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া কমিয়ে দেন। তিনি এই মহড়াকে উত্তর কোরিয়ার জন্য ‘শত্রুতাপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেন। এরপর বুধবার (১৯ আগস্ট) ট্রাম্প জানান, তিনি বছরের শেষ দিকে কিমের সঙ্গে দেখা করার আশা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার আলোচনা আবারও শুরু করতে ট্রাম্প আগ্রহী বলে জানিয়েছেন মার্কিন ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় অবগত এক ব্যক্তি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করাও ট্রাম্পের এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, দক্ষিণ কোরিয়াও ট্রাম্পের কৌশলের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর বিষয়ে সিউলের কর্মকর্তাদের এখনো কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে।
চলতি বছরের শেষ দিকে চীনের শেনঝেনে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন বা এপেক সম্মেলনে ট্রাম্পের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তর কোরিয়া আলোচনায় আগ্রহী হলে ওই অঞ্চলে ট্রাম্প ও কিমের বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের এক মুখপাত্র বলেছেন, কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত। উপযুক্ত সময়ে ট্রাম্প ও কিম আবারও বৈঠক করবেন।
তবে উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া বলছে, কিম ও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো হলেও জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রে পিয়ংইয়ং কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।
কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ সামরিক মহড়ার পরিসর কমানোর সিদ্ধান্তকেও যথেষ্ট মনে করেননি। তার দাবি, মহড়ার ধারাবাহিকতা এখনো আগ্রাসী এবং উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এখনো শত্রুতাপূর্ণ।
তিনি আরও দাবি করেন, ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে সম্প্রতি কোনো যোগাযোগ হয়নি। তবে দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ককে তিনি ‘চমৎকার’ বলে উল্লেখ করেন।
এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার উত্তর কোরিয়া পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী। বিশ্লেষকদের ধারণা, চলমান যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়ার প্রতিবাদ হিসেবেই এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়ে থাকতে পারে।
কিম ইয়ো জং সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তকে কোনো ধরনের ‘সদিচ্ছার পদক্ষেপ’ হিসেবে উপস্থাপন করে, তাহলে তারা যে প্রতিক্রিয়া আশা করছে, তা পাবে না।
বৈঠকের জন্য কঠিন শর্ত উত্তর কোরিয়ার
বিশ্লেষকদের মতে, কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তন করতে হতে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক জেনি টাউনের মতে, উত্তর কোরিয়ার শর্তগুলোর মধ্যে থাকতে পারে দেশটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ‘শত্রুতাপূর্ণ’ নীতি পরিবর্তন করা এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতাকে মেনে নেওয়া। অন্তত উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র আর অনুসরণ করছে না— এমন ঘোষণা চায় পিয়ংইয়ং।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়াকে সম্পূর্ণ পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার বিষয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান এখনো অপরিবর্তিত।
২০১৮ ও ২০১৯ সালে ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে একাধিক ঐতিহাসিক বৈঠক হয়েছিল। তবে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি নিয়ে আলোচনা ভেঙে যায়।
এরপর ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে উত্তর কোরিয়াকে ‘পারমাণবিক শক্তিধর’ দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও তাঁর প্রশাসন এখনো উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের দাবি করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
এবার কিমের তাড়াহুড়ো নেই
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় এবার কিম জং উনের আলোচনায় বসার প্রয়োজনীয়তাও কমে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এর কারণ, গত কয়েক বছরে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। দুই দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ায় উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিনিময়ে আলোচনায় বসার চাপ এখন আগের তুলনায় কম।
জেনি টাউনের মতে, উত্তর কোরিয়ার হাতে এখন এমন কিছু বিকল্প রয়েছে, যেখানে কোনো বড় ধরনের ছাড় দিতে হচ্ছে না। তাই নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা থাকলে আলোচনায় দ্রুত ফিরে যাওয়ার জন্য কিমের তেমন কোনো উৎসাহ নেই।
আলোচনা পুরোপুরি বন্ধও করছে না পিয়ংইয়ং
তবে উত্তর কোরিয়ার বক্তব্যকে সরাসরি আলোচনার প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং মিনের মতে, কিম ইয়ো জংয়ের বক্তব্য এমনভাবে দেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা করার পথ খোলা থাকে।
তাঁর মতে, পিয়ংইয়ং মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে আরও নমনীয় অবস্থানে আনতে চাইছে। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান ও প্রত্যাশা সম্পর্কে ট্রাম্পকে একটি নির্দিষ্ট ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘পারস্পরিক অবস্থান যাচাই’ ও সংকেত দেওয়ার পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
এদিকে কিম ইয়ো জংয়ের বক্তব্যে জাপানেরও কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। উত্তর কোরিয়া জাপানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা সহযোগিতাকে ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে দেখছে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প কিমের সঙ্গে নতুন বৈঠক চান ঠিকই, কিন্তু পিয়ংইয়ংয়ের সাম্প্রতিক অবস্থান বলছে, শুধু ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক দিয়ে বৈঠক নিশ্চিত করা যাবে না; উত্তর কোরিয়া এবার নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়কে আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে চাইছে।
সূত্র : রয়টার্স
সময়ের আলো/ইউএমএইচ