দিল্লিতে আশ্রিত বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত ৫ আগস্টের বক্তব্যকে ঘিরে বাংলাদেশের জনমনে তৈরি ক্ষোভের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে ঢাকা-দিল্লি কূটনীতিতেও। এর জেরে স্থগিত হয়ে যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্ধারিত ভারত সফর।
তবে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগে বরফ গলার ইঙ্গিত মিলছে। সব ঠিক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লি সফরে যেতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে হোক কিংবা দ্বিপক্ষীয় সফর- সম্ভাব্য এই সফরকে দুই দেশের টানাপোড়েন কমিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য যে বাংলাদেশের জনমনে এত বিস্ফোরণ ঘটাবে তা ভারত সরকার আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি। ফলে দুপক্ষ প্রস্তুতি নিলেও গত ২১ থেকে ২৫ আগস্ট তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর পণ্ড হয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে ঢাকা-দিল্লির মধ্যকার এই টানাপোড়েনকে কাজে লাগাতে ব্যাপক সোচ্চার ছিল দেশের বিরোধী দল। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপি বিরোধী দলকে সেই সুযোগ দেয়নি। এক পর্যায়ে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ফেরতের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর বাতিল করে ঢাকা। শেষ পর্যন্ত ভারত সরকার তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে এবং রাজনৈতিকভাবে বার্তা দিয়েছে।
গত শনিবার সকালেও এই সফর নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক বার্তার আদান-প্রদান হয়। উভয় দেশের উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে কাজ করছে। তাদের বার্তা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে, এ বিষয়ে আপাতত উভয়পক্ষই নীতিগতভাবে সম্মত।
তবে এ সফর কী ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে হবে, নাকি সম্পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় হবে এখন তা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে যে উদ্দেশ্যেই সফর হোক না কেন সেখানে দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, এটা চূড়ান্ত, যাতে দুপক্ষই সম্পর্কের টানাপোড়েন কমাতে নিজেদের করণীয় সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই টানাপোড়েন কমাতে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী উভয়পক্ষের সঙ্গে অবিরাম আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলস্বরূপ
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে শিগগিরই ‘ত্রিবেদী চমক’ দেখা যেতে পারে।
শনিবার নয়াদিল্লিতে ইকোনমিক টাইমস ওয়ার্ল্ড লিডার্স ফোরামে অংশ নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক প্রসঙ্গে বলেন, যেকোনো সম্পর্ক নিয়ে কাজ করতে হলে তাকে পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষা পাস করতে হবে। উভয়পক্ষকেই এটা করতে হবে। একে অপরের স্বার্থকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সম্মান করা একান্ত জরুরি।
বিহারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ও জলসম্পদ মন্ত্রী বিজয় কুমার চৌধুরী শনিবার ভারতীয় একটি সংবাদ মাধ্যমে জানান, গত শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিহারের ফারাক্কা ব্যারাজ ও ভারত-বাংলাদেশ পানি বণ্টন চুক্তি সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন। চুক্তিটি বছরের শেষে নবায়ন হওয়ার কথা এবং বিহারের স্বার্থ যেন উপেক্ষিত না হয় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ বৈঠকে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনও উপস্থিত ছিলেন।
সদ্য নিয়োগ পাওয়া পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হব। আমরা একটি ইতিবাচক সম্পর্ক চাই। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই তা করতে হবে। আমরা যদি আগামীকালও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারি, তা হলে আগামী সপ্তাহে যেতে পারি, অথবা পরের সপ্তাহেও যেতে পারি। এখানে কোনো তাড়াহুড়া নেই। এখানে আলোচনার বিষয় আছে, প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয় আছে।
প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সফর তো এমন নয় যে, হুট করে গিয়ে হয়ে গেল। এটা কোনো খেলার বিষয় নয়। দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠকের আগে কিছু প্রস্তুতি ও ভিত্তি তৈরি করতে হয়। আমরা সেটিই করছি। সেখান (ভারত) থেকেও ইতিবাচক মনোভাব ও সদিচ্ছার ইঙ্গিত আসছে।
তারা স্বীকার করেছে, বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে- বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর পলাতক শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছে। তারা বিষয়টি লক্ষ করেছে। এখন আমরা দেখি, বাকি আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয় কি না। আলোচনার ভিত্তিতে এবং আমাদের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সময় উপযুক্ত হলেই আমরা অবশ্যই ভারত সফরে যাব।
ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক রাধা দত্ত সময়ের আলোকে বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের একে অপরের প্রয়োজন। তা হলে সম্পর্কগুলো কেন আরও কঠিন হয়ে উঠছে? বলা যেতে পারে, কিছু ক্রমাগত অস্বস্তিকর বিষয় থাকা সত্ত্বেও, ভারত ও বাংলাদেশকে সম্পর্ক ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে বলে মনে করা হচ্ছিল না।
বিরোধের প্রধান বিষয়গুলো হলো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সেইসঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদেরও। হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়াটা বোধগম্য ছিল, কিন্তু বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাকে যে রাজনৈতিক পরিসর দেওয়া হয়েছিল, তা ঢাকায় খুব একটা ভালোভাবে দেখা হয়নি। হাসিনার ৫ আগস্টের ভার্চুয়াল মিডিয়া আলাপচারিতার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, যা ঢাকাকে ‘ক্ষুব্ধ’ করেছিল। অনুষ্ঠানটি বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ সত্ত্বেও এটি হয়েছিল।
এরপর ঢাকা হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং যুবনেতা ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের হস্তান্তরের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে- যে বিষয়গুলো এমনিতেও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অংশ হতো।
অন্যদিকে নয়াদিল্লি দাবি করে, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংস্থা দ্বারা আয়োজিত হয়েছিল এবং ভারত সরকার এটি সমর্থন করেনি বা এতে অংশ নেয়নি। এই ধরনের কূটনৈতিক বক্তব্য দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে চলার কৌশল বাংলাদেশে তেমন কোনো সাড়া জাগায়নি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমি মনে করি ভারতের কাছে বাংলাদেশের বার্তাটি খুব স্পষ্ট। বাংলাদেশের জনমনে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে যেভাবে ভারত বিরোধিতা উসকে উঠেছিল, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভারতে আশ্রয় এবং দিল্লিতে বসে বাংলাদেশ নিয়ে বক্তব্য দেওয়া, পাশাপাশি ভারতীয় সীমান্ত বাহিনী দ্বারা সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে পুশইনের মতো কার্যক্রম চালু রাখা সেই ভারতবিরোধী মনোভাব বরং শক্ত করেছে। ফলে বাংলাদেশের জনগণের কাছে কীভাবে সদিচ্ছার প্রমাণ দেবে তা ভারতকে পুনরায় ভাবতে হবে।
অপরদিকে কঠোর অবস্থানে গিয়ে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে আপাতদৃষ্টিতে কিছু না পেলেও ভারতকে বাংলাদেশের ইস্যুগুলোর আর্জেন্সি ও গুরুত্ব বোঝাতে পারছে। একই সঙ্গে বিএনপি সরকার ভারতবিরোধিতার অজুহাতে সরকারবিরোধীদের কোনো রাজনৈতিক স্পেস দিচ্ছে না।
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, দুই দেশের জনসংখ্যা ১৭০ কোটির কাছাকাছি। পারস্পরিক বৈরিতা এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে জিম্মি করবে। আমি মনে করি, এ মুহূর্তে উভয় তরফে কূটনৈতিক পদ্ধতি শক্তিশালী করে বৈরিতা নিরসনের জন্য আশু উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। আর এই উদ্যোগের ভিত্তি হতে পারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং বাংলাদেশের উদ্বেগগুলো আমলে নেওয়া।
প্রাথমিক পর্যায়ে দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত হতে পারে এমন বক্তব্য না দিতে দুই দেশ সম্মত হতে পারে। ভারত সীমান্ত হত্যা ও পুশইন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারে। একে অপরের মাটি ব্যবহার করে একে অপরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী কোনোরূপ প্রচার বা কর্মকাণ্ডের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। তার মানে কী এই যে, আমি প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে না যাওয়া সমর্থন করছি? না, সমর্থন করছি না। কূটনীতি অনেকভাবে করা যায়। আমি এক পা এগিয়ে কূটনীতি পরিচালনার পক্ষে।
আমি বৈরী পক্ষের ভেতরে ঢুকে উষ্ণ পরিবেশ তৈরির পক্ষে। গোস্বা করলে, মনোমালিন্য জিইয়ে রাখলে, একগুঁয়েমি বহাল রাখলে, শর্ত দিলে কূটনীতির ক্ষেত্র কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়ে। আমি একঘরে হয়ে কূটনীতি করতে চাই না। বরং ‘সারা পৃথিবীকে আপন ঘর’ করতে চাই।
সময়ের আলো/এসএকে