প্রেমে বিয়ে শেষে স্বামীর সঙ্গে ভোলা থেকে রাজধানীতে এসেছিলেন পারমিতা। সদ্য এইচএসসি পাস করা পারমিতার বয়স তখন ১৮ বছর। তরুণ দম্পতি বাসা ভাড়া নিয়ে সংসার শুরু করেন। স্বল্প বেতনের চাকরি করা স্বামী রাসেল (ছদ্মনাম) স্ত্রীকে ভর্তি করে দেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কয়েক মাস পর রাতে বাসায় সিগারেটের গন্ধ পেতে শুরু করেন রাসেল। এর কয়েক মাস পর জানতে পারেন, তার স্ত্রী ইয়াবায় আসক্ত। স্ত্রীও বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেন। জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের কাছ থেকেই সিগারেট ও ইয়াবা সেবন শুরু করেন তিনি।
অনেক চেষ্টা করেও স্ত্রীকে মাদক থেকে ফেরাতে পারেননি রাসেল। শেষ পর্যন্ত তাদের বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। বর্তমানে রাসেল উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে আছেন এবং নতুন করে সংসার শুরু করেছেন। তার সাবেক স্ত্রী পারমিতা কোথায় আছেন, সে তথ্য জানাতে পারেননি রাসেল।
শুধু পারমিতাই নন, দেশে, বিশেষ করে রাজধানীতে নারীদের মধ্যে মাদকাসক্তের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
অনেক নারী গাঁজা, ইয়াবা ও ইলেকট্রিক সিগারেটে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি এক শ্রেণির তরুণী বারে গিয়ে নিয়মিত মদ পান করছেন। মাদকাসক্ত নারীদের মধ্যে শিক্ষার্থী ও বেকারের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিত চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীও রয়েছেন।
নারী মাদকসেবীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আহছানিয়া মিশনের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বর্তমানে ৩টি বেড থাকলেও ৩৩ নারী মাদকাসক্ত ভর্তি আছেন। তাদের বেশিরভাগই মানসিকভাবেও অসুস্থ।
আহছানিয়া মিশনের গত ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারী মাদকাসক্তদের ৭৩ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। প্রায় ২৪ শতাংশের বয়স ৩৬ থেকে ৪৫ বছর। নারী মাদকসেবীদের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ ইয়াবা এবং ৪৩ শতাংশ গাঁজায় আসক্ত। অ্যালকোহলে আসক্ত প্রায় ৭ শতাংশ। চিকিৎসাধীনদের ৭৭ শতাংশের বসবাস ঢাকায়। নিয়মিত মাদক সেবনকারী নারীদের মধ্যে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং বেসরকারি চাকরিজীবী রয়েছেন। রয়েছেন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক, গৃহিণী, ব্যবসায়ী ও বেকারও।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায় নীলার (৪১)। বিয়ের পর স্বামীর হাত ধরে মাদক নেওয়া শুরু তার। দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর মাদক গ্রহণের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। একপর্যায়ে শুরু হয় দাম্পত্য কলহ। এর জেরে তাদের বিয়েবিচ্ছেদ হয়। পরে আবার বিয়ে করেন নীলা এবং তৃতীয় সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু এরপরও মাদক থেকে বের হতে পারেননি তিনি।
নীলা জানান, দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণের ফলে তিনি অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়তেন। হঠাৎ রেগে গিয়ে কখনো কখনো আক্রমণাত্মক আচরণ করতেন। অতিরিক্ত কথা বলতেন এবং ঠিকমতো ঘুমাতেন না। বাসার জিনিসপত্র ভাঙচুর করতেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়াঝাটি লেগে থাকত। নিজের ক্ষমতা ও সামর্থ্য সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারণাও প্রকাশ করতে শুরু করেন।
এসব আচরণ তার দাম্পত্য সম্পর্কে গুরুতর অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়। তবে পরবর্তীতে রাজধানীর একটি মাদকাসক্ত নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়ে অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছেন তিনি। বর্তমানে একটি স্বনামধন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।
অল্প বয়সেই বিয়ে হয় রুমার (৩৯)। তিন সন্তান নিয়ে ছিল তার সুখের সংসার। বিয়ের পর স্বামীর মাধ্যমে সিগারেট ও গাঁজা সেবনের সূচনা হয় তার। পরে বন্ধুদের সংস্পর্শে এসে ইয়াবা গ্রহণ শুরু করেন।
প্রথমদিকে রুমা বিশ্বাস করতেন, মাদক তার মানসিক চাপ কমাতে, একাকীত্ব ভুলতে এবং সামাজিকভাবে মানিয়ে নিতে সাহায্য করছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এ ব্যবহার নির্ভরশীলতায় রূপ নেয়। স্বামীর মানসিক অসুস্থতা, দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, পরিবারের সদস্যদের দোষারোপ এবং আবেগগত একাকীত্ব তার মাদক নেওয়া আরও বাড়িয়ে দেয়।
ক্রমশ তার আচরণ ও জীবনযাপনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দেয়। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি। সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব ও যত্ন কমে যায়, দাম্পত্য সম্পর্কে অবনতি ঘটে এবং পরকীয়াসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে জড়িয়ে পড়েন। মাদক গ্রহণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ সময় মাদকসেবী বন্ধুদের সঙ্গে কাটাতে শুরু করেন।
পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি তা অস্বীকার করতেন এবং নিজের আচরণের জন্য পরিবারকে দায়ী করতেন। এতে পারিবারিক সম্পর্ক আরও ভেঙে পড়ে। বর্তমানে তিনিও রাজধানীর একটি মাদকাসক্ত নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে, বিশেষ করে রাজধানীতে নারীদের মধ্যে অ্যালকোহলে আসক্তির সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বারে নিয়মিত অ্যালকোহল সেবন করেন এমন একাধিক নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন অনেক বারেই নারী অ্যালকোহল সেবনকারীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যায়। বিশেষ করে যেসব বারে নিরাপত্তা ও পরিবেশ ভালো, সেসব বারে নারীদের আনাগোনা বেশি বলে জানান তারা।
এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর মদ পানের পারমিট বা লাইসেন্স পেতে হাজারেরও বেশি তরুণী আবেদন করেছেন। এর মধ্যে ৩০ জুন পর্যন্ত ৭ শতাধিক তরুণীর নামে পারমিট ইস্যু করা হয়েছে। বর্তমানে আরও কয়েকশ পারমিট হস্তান্তরের অপেক্ষায় চূড়ান্ত অবস্থায় রয়েছে।
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গুলশান, তেজগাঁও ও উত্তরা এলাকায় মদ পানকারী নারীর সংখ্যা সর্বোচ্চ। চলতি বছর এ তিন এলাকার মধ্যে গুলশানে ২৮৮, উত্তরা ২০৭ এবং তেজগাঁওয়ে ৬২ জন নারী মদ পানের পারমিট নিয়েছেন। এ ছাড়া ধানমন্ডি, মতিঝিল, খিলগাঁও ও রমনা এলাকা থেকেও অনেকে মদ পানের পারমিটের জন্য আবেদন করেছেন। তবে এদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন মদের বারে পেশাদার ‘বার গার্ল’ হিসেবে কাজ করেন বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে ডিএনসির মুখপাত্র ও সহকারী পরিচালক মো. আবদুল হালিম রাজ বলেন, অ্যালকোহল সেবনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণসাপেক্ষে প্রাপ্তবয়স্ক যে কেউ আবেদন (পারমিট) করতে পারেন। সেখানে নারী-পুরুষের কোনো জেন্ডারিং করা হয় না।
নারীদের মধ্যে অ্যালকোহল পানের পারমিটের আবেদনকারীর সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাতে পারেননি তিনি।
সময়ের আলো/এসএকে