বায়তুল মোকাররমের কয়েকটি জুয়েলারি দোকান ঘুরে স্বর্ণের দামের খোঁজখবর নিচ্ছেন হাশেম সাহেব। সামনে তার মেয়ের বিয়ে। স্বর্ণ ছাড়া বিয়ে- ভাবাই যায় না। যেমন একটি গানের কলি আছে, ‘ফুলে গন্ধ নেই, আমি ভাবতেই পারি না।’ যে দোকানেই যান, ঘুরেফিরে দাম একই। অর্থাৎ ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি ২ লাখ ৪৬ হাজার ১১০ টাকা। ২১ ক্যারেটের দাম ২২ ক্যারেটের তুলনায় কিছুটা কম- ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩০ টাকা। আর সনাতনী পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮১২ টাকা।
হাশেম সাহেব এক সপ্তাহ আগেও এসেছিলেন। তখন ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৭৯ টাকা। অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় বেশ কিছুটা কম। তার এক বন্ধু এক মাস আগে জানিয়েছিলেন, তখন ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। তবে ওই সময় দাম কিছুটা ওঠানামা করেছে। এক পর্যায়ে তা ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্তও উঠেছিল।
বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সভাপতি এনামুল হককে গতকাল রোববার প্রশ্ন করা হয়েছিল, স্বর্ণের দাম কি আরও কমবে? তিনি বলেন, এটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। অনেকে হয়তো এটিকে অনুমাননির্ভর বক্তব্য বলতে পারেন। কিন্তু আমাদের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে এমন কিছু বলা ঠিক হবে না। তবে সরকার যে স্বর্ণের নীতিমালা তৈরি করেছে, সেটি অনুমোদিত হলে একটি সঠিক পদ্ধতিতে স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। আশা করছি, আগামী মন্ত্রিসভা বৈঠকে এই নীতিমালা উপস্থাপন হতে পারে।
এ তো গেল বাংলাদেশের স্বর্ণের দামের কথা। কিন্তু বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম নিয়েও আলোচনা থেমে নেই। কয়েক মাস ধরে ব্যাপক ওঠানামার পর মূল্যবান এই ধাতুটির দাম এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সবার মনে নতুন প্রশ্ন- স্বর্ণের দাম কি আরও কমবে নাকি বাড়বে?
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৬৮০ ডলারে উঠেছে। বলা যায়, তিন মাসের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ দাম। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কেন বাড়ল?
বিশ্লেষকদের অভিমত, দুর্বল মার্কিন ডলার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রেকর্ড পরিমাণ স্বর্ণ কেনার কারণে
দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, স্বর্ণ কিনে কী লাভ? আসলে অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বিনিয়োগের জন্য স্বর্ণ একটি নিরাপদ মাধ্যম।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই মূল্যবান ধাতুতে বিনিয়োগ করা বুদ্ধিমানের কাজ। সময়ের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির কারণে কাগজের মুদ্রার প্রকৃত মান কমতে থাকে। স্বর্ণ মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণকে একটি বাস্তব ও নির্ভরযোগ্য সম্পদ হিসেবে বেছে নেন।
রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে গত ২০ বছরে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ শতাংশ। অথচ একই সময়ে প্রতি বছর স্বর্ণের দাম গড়ে ১০ শতাংশ করে বেড়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাদ দিলেও স্বর্ণের প্রকৃত মূল্য প্রতি বছর গড়ে ৭ শতাংশ হারে বেড়েছে।
শেয়ারবাজারে ধস নামলে কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হলে স্বর্ণ ভালো রিটার্ন দিতে পারে। স্বল্প মেয়াদে এর দামে ওঠানামা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি তার প্রকৃত মূল্য ধরে রাখে।
বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কেনাকাটা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার পরিমাণ এখন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গত জুনে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মোট ৫৭ টন স্বর্ণ কিনেছে। শনাক্তযোগ্য ক্রেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল চীন। দেশটি ওই মাসে ৪০ টন স্বর্ণ কিনেছে। তবে একই সময়ে লন্ডনে ৩২ টন মুদ্রা স্বর্ণ প্রবেশ করেছে বলে গোল্ডম্যান স্যাকসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এই ধারাবাহিক চাহিদা স্বর্ণের দামের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করছে।
বাজারে বিনিয়োগকারীদের মনোভাবও পাল্টাচ্ছে। বড় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখন স্বর্ণকে তুলনামূলক আকর্ষণীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন।
আরেকটি বিষয় স্বর্ণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে- যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ। মার্কিন সরকারের ফেডারেল ঋণ সম্প্রতি ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এর ফলে মুদ্রার মূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকেন। এই পরিস্থিতিতে স্বর্ণের দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আজ সোমবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট একটি সিনেটে বক্তব্য রাখতে পারেন। তার এই বক্তব্য শেষ পর্যন্ত স্বর্ণের দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এত স্বর্ণ কোথায় রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো?
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, স্বর্ণ সবসময় নিজ দেশে রাখা হয় না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বর্ণের মজুদ নিরাপদ রাখতে লন্ডন, নিউইয়র্কসহ আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রগুলোর ওপর ভরসা করে। তবে এক জায়গায় স্বর্ণ না রেখে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে রাখার প্রবণতা বাড়ছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জরিপ অনুযায়ী, অংশ নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ৫৭ শতাংশ তাদের স্বর্ণের কিছু অংশ ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রাখে। বিদেশে স্বর্ণ রাখার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় কেন্দ্র। এরপর রয়েছে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ। এ ছাড়া সুইজারল্যান্ডে অবস্থিত ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস এবং ফ্রান্সের ব্যাংক দ্য ফ্রঁসেও বিভিন্ন দেশের স্বর্ণের মজুদ রাখা হয়।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন নিউইয়র্ক বা লন্ডনে স্বর্ণ রাখে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক? এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, আর্থিক বাজার ও স্বর্ণ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার সঙ্গে সংরক্ষিত স্বর্ণের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। ফলে প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দ্রুত আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণ ব্যবহার করতে পারে।
তবে বিদেশের ব্যাংকে স্বর্ণ রাখার ক্ষেত্রে সুবিধার পাশাপাশি বেশ কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। যেমন, কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হলে সেখানে রাখা সম্পদ আটকে যেতে পারে। এমনকি মালিকানা থাকলেও সেই সম্পদে তাৎক্ষণিক প্রবেশাধিকার সীমিত হতে পারে।
এর অন্যতম উদাহরণ হিসেবে গোল্ডম্যান স্যাকস ২০১৮ সালে ভেনেজুয়েলার স্বর্ণ নিয়ে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সঙ্গে তৈরি হওয়া বিরোধের কথা উল্লেখ করেছে। এ ধরনের ঘটনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে স্বর্ণের মজুদ একাধিক দেশে রাখার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
সময়ের আলো/এসএকে