রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাধারণত মঞ্চে, মিছিলে কিংবা নির্বাচনি মাঠে হওয়ার কথা। কিন্তু কখনো কখনো সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা গিয়ে হাজির হয় দলের নেতার, প্রতিষ্ঠাতার কবরের সামনেও। ফুল দিতে গিয়ে কে আগে যাবেন, কে সামনে থাকবেন এ নিয়ে শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি, ঠেলাঠেলি। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং ‘ফুল দেওয়ার দৌড়’ চলছে। সবচেয়ে মজার বিষয়, যে নেতারা সাধারণ মানুষকে শৃঙ্খলা, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেন, ক্যামেরা চালু হলেই তাদের কেউ কেউ সেই শিক্ষার ব্যবহারিক পরীক্ষা দিয়ে বসেন। কবরের সামনে ফুলের তোড়া তখন হয়ে ওঠে একেকটি ‘রাজনৈতিক পদক’, আর সামনে যাওয়ার কয়েক হাত জায়গা যেন হয়ে যায় অঘোষিত ক্ষমতার মাপকাঠি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অবশ্য এসব দৃশ্যের প্রতি বেশ উদার। কয়েক মিনিটের ঠেলাঠেলি কয়েক দিনের হাসির খোরাক হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠাতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত দলীয় ঐক্য, শৃঙ্খলা ও নেতাদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিই যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তা হলে ফুলের তোড়ার সঙ্গে একটু সংযমও নিয়ে যাওয়া বোধ হয় মন্দ নয়।
‘জিয়ার মাঝারে ফুল দিতে গিয়ে হুড়োহুড়ি’- এমন শিরোনাম নতুন নয়। কয়েক দিন পরপর দলের প্রতিষ্ঠাতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে এমন দৃশ্যের অবতারণা করেন বিএনপি নেতাকর্মীরা- যা সামাজিকমাধ্যমে সয়লাব হয়ে পড়ে। সমালোচনার মুখে পড়ে দলীয় শৃঙ্খলা কার্যক্রম।
নেতাকর্মী সমর্থক অনুসারীদের নিয়ে সোমবার দুপুর ১২টার দিকে শেরেবাংলা নগরে জিয়া উদ্যানে যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে নিজেই কর্মীদের হুড়োহুড়ি আর ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়েন। লাঠির ওপর ভর করে চলা অসুস্থ রিজভী ধাক্কাধাক্কির চোটে অনেকটা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হন। একে তো তীব্র গরম, ধাক্কাধাক্কি, গায়ের ওপর গা- যেন দম ফেলার মতো পরিস্থিতি নেই। সামনের সারির নেতাদের সহায়তায় কোনোমতে তিনি শ্রদ্ধা নিবেদনে সক্ষম হন। পরে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দিয়েছেন। এখন আমাদের কর্তব্য হবে দলকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা। দলের চেয়ারম্যান নির্দেশিত যে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চলমান, সেটি যাতে সুসম্পন্ন করা যায় এবং সুন্দরভাবে এই প্রক্রিয়া নিষ্পন্ন করা যায় সেটিই আমরা চেষ্টা করব।
জিয়া উদ্যানে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে নেতাকর্মীদের অতিরিক্ত ভিড় ও শৃঙ্খলার অভাবে মাঝেমাঝে হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস, দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বা কেন্দ্রীয় নেতাদের যেকোনো কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতির কারণে এই ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। নেতাকর্মীরা বলছেন, এর প্রধান কারণ অতিরিক্ত জনসমাগম। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে হাজার হাজার নেতাকর্মীর একসঙ্গে সমাধি প্রাঙ্গণে প্রবেশের চেষ্টা। নির্দিষ্ট নিয়ম বা সারিবদ্ধভাবে শ্রদ্ধা জানানোর পরিবর্তে আগে ফুল দেওয়ার তাড়া। শীর্ষ নেতাদের কাছাকাছি যাওয়ার বা নিজেদের উপস্থিতি দেখানোর প্রতিযোগিতা। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং সমাধির পবিত্রতা রক্ষা করতে স্বেচ্ছাসেবক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কড়া নজরদারি ও ব্যারিকেড ব্যবহারের তাগিদ দিচ্ছেন সিনিয়র নেতারা।
তারা বলছেন, নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য দলের পক্ষ থেকে বারবার নির্দেশনা দেওয়া হলেও এতে কাজ হয় না। বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বহুবার এসব ঘটনায় নেতাকর্মীদের ওপর চটেছেন। মাঝেমধ্যে তাদের আচরণে চড়াও হয়েছেন। তাতেও কাজ হয়নি।
জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের শ্রদ্ধা নিবদনেও এমন হুড়োহুড়ি দেখা যায় মাঝেমধ্যে। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান সময়ের আলোকে বলেন, সত্যিকার অর্থে আমরাও এই দৃশ্য নিয়ে বিব্রত। আমরা বারবার বলার চেষ্টা করছি রাজনীতি মানে স্লোগান কিংবা হুড়োহুড়ি নয়। রাজনীতির দর্শনকে উপলব্ধি করতে হবে। কিন্তু নেতাকর্মীদের এই বোধদয় হচ্ছে না। কী করব বলেন? এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা চিন্তা করছি সাংগঠনিকভাবে এ সংক্রান্ত কোনো প্রশিক্ষণ কিংবা অন্য কোনো পথ খুঁজে বের করা যায় কি না।
গত বছরের শেষদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের নবগঠিত কমিটির নেতারা বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে ফুল দিতে যান। এ সময় ধাক্কাধাক্কিতে জড়ান বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে নেটিজেনদের সমালোচনার মুখে পড়েন ঢাকা-৬ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন।
এ নিয়ে ইশরাক তার ফেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে ধাক্কাধাক্কির বিষয়ে নেতাকর্মীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ঘটনার ব্যাখ্যাও দেন।
ধাক্কাধাক্কির ঘটনায় গণমাধ্যমের অতিরিক্ত ক্যামেরার কথা টেনে আনেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, সবাই নিজের ছবি দেখাতে ব্যস্ত। দলের মুখপাত্র নিজেই ঠিকমতো গণমাধ্যমে কথা বলতে পারেন না তাদের কারণে। মধ্যম সারির নেতারা এই ধাক্কাধাক্কিটা বেশি করে থাকে। আমরা জিয়াউর রহমান ও ম্যাডাম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে শৃঙ্খলা ও আদর্শ শিখেছি। রাজনীতিতে সিনিয়র জুনিয়রদের অবস্থান মেনে চলাটা জরুরি। এটা নিশ্চিত করতে পারলে আর হুড়োহুড়ি হতো না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে