বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার কারণে ইউরোপে তাপপ্রবাহের মাত্রা বাড়ছে। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে গলিত ঠান্ডা পানির প্রবল স্রোত সমুদ্রের তাপমাত্রা বদলে দিচ্ছে এবং জেট স্ট্রিমের দিক পরিবর্তন করছে। ফলে পশ্চিম ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তাপপ্রবাহের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার হার যতই বাড়ছে, জলবায়ু মডেলগুলোর বর্তমান পূর্বাভাসের চেয়েও ইউরোপকে হয়তো আরও ঘনঘন তীব্র তাপপ্রবাহের শিকার হতে হবে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফি সেন্টারের অন্যতম গবেষক মেরিলিনা ওল্টম্যানসের মতে, নতুন আবিষ্কৃত এই ‘বায়ুমণ্ডলীয় সেতু’ চলতি গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। ওল্টম্যানস বলেন, ইউরোপ দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে। জেট স্ট্রিমের পরিবর্তনের কারণেই এমনটি ঘটছে। ভবিষ্যতে... এটি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। ভবিষ্যতে আমরা ভাবব, গত বছরের তাপপ্রবাহ মোটেও কোনো তাপপ্রবাহ ছিল না। এ বছরের চেয়ে গত বছরই বেশ ঠান্ডা ছিল।
বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রার ধারাবাহিক বৃদ্ধি তাপপ্রবাহ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আবহাওয়ার প্রচলিত ধরনের পরিবর্তনও এতে ভূমিকা রাখছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৩০ বছরে ইউরোপের ওপর বারবার উচ্চচাপের রিজ (আবহাওয়ার মানচিত্রে দেখতে উল্টো ‘ইউ’ এর মতো) বাতাসের বড় ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। এর ফলে মেঘমুক্ত রোদ ঝলমলে আকাশ ও তীব্র তাপপ্রবাহের সৃষ্টি হচ্ছে।
উত্তর গোলার্ধকে ঘিরে প্রবাহিত শক্তিশালী বাতাসের বেল্ট বা ‘জেট স্ট্রিম’এ তরঙ্গ বা ঢেউয়ের সৃষ্টি হলে এই রিজগুলো তৈরি হয়। সোজা পথে প্রবাহিত এই জেট স্ট্রিম যখন আঁকাবাঁকা হয়ে পশ্চিম ইউরোপের দিকে উত্তরমুখী বাঁক নেয়, তখন মধ্য আটলান্টিক ও সাহারা মরুভূমির গরম বাতাস এই রিজের ভেতরে যাওয়ার সুযোগ পায়।
ইউরোপের ওপর বিস্তৃত উচ্চচাপের রিজ তৈরি হওয়া বছরগুলোতে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ দেখা গেছে। যেমন ২০০৩ সালের তাপপ্রবাহে ৭০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। গবেষকরা জানান, ইউরোপে এই রিজ গঠনের মূল কারণ হিসেবে গ্রিনল্যান্ডকে চিহ্নিত করা যায়। যে বছর বিস্তৃত রিজ তৈরি হয়, তার আগের গ্রীষ্মে গড়ে ৮১ বিলিয়ন টন অতিরিক্ত গলিত পানি বরফস্তর থেকে নেমে আসে।
এই ঠান্ডা গলিত পানি শরৎ ও শীতকালে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ার সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। মিষ্টি পানির এই প্রবাহ সমুদ্রের নিচের স্তরের অপেক্ষাকৃত লবণাক্ত ও গরম পানির সঙ্গে মিশতে বাধা দেয়, যা উপরিভাগকে আরও শীতল করে তোলে।
বরফগলা পানির এই সাময়িক প্রভাব যুক্ত হয় ‘কোল্ড ব্লব’-এর সঙ্গে। যা উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের তাপমাত্রার একটি দীর্ঘমেয়াদি হ্রাস। কিছু বিজ্ঞানীর মতে, আটলান্টিকের সামুদ্রিক স্রোতব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণেই এই কোল্ড ব্লব তৈরি হয়েছে। গলিত পানি ও কোল্ড ব্লব দুইয়ে মিলে এই শীতল পানি এবং আটলান্টিকের আরও দক্ষিণে থাকা উষ্ণ পৃষ্ঠের পানির মধ্যে এক তীক্ষè তাপমাত্রা ফ্রন্ট তৈরি করে।
এই সীমান্তের দক্ষিণে থাকা গরম বাতাস ওপরের দিকে উঠে যায় এবং উত্তরের ঠান্ডা বাতাস নিচে নেমে আসে। ফলে এগুলো ঘুরতে শুরু করে এবং ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি করে। এর কারণে জেট স্ট্রিম আরও বেশি তরঙ্গায়িত হয়ে পড়ে। এটি এই ঘূর্ণিঝড়গুলোর দক্ষিণ দিক দিয়ে আঁকাবাঁকা হয়ে প্রবাহিত হতে থাকে এবং পরে পুনরায় উত্তর দিকে বাঁক নিয়ে পশ্চিম ইউরোপের ওপর চলে আসে। আর এভাবেই সেখানে দীর্ঘস্থায়ী, উচ্চচাপের রিজ এবং ভয়াবহ তাপপ্রবাহের উৎপত্তি ঘটে। ওল্টসম্যানস আরও বলেন, এটি একটি বড় সমস্যা। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তাপপ্রবাহ ও খরা আরও তীব্র রূপ নেবে, তাই আবহাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কিত বর্তমান অনুমানগুলো সম্ভবত বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে কম করে ধরা হচ্ছে। গত জুলাইয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আটলান্টিক মহাসাগরে জেট স্ট্রিম দক্ষিণ দিকে সরে গেছে, যা এই গবেষণায় দেখানো প্যাটার্নের মতোই। তবে সেই গবেষণার সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, এটি জলবায়ুর প্রাকৃতিক ওঠানামার কারণে ঘটছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।
যুক্তরাজ্যের রিডিং ইউনিভার্সিটির গবেষক জন মেথভেন জুলাইয়ের ওই গবেষণার অন্যতম লেখক। তার মতে, গ্রিনল্যান্ডের গলিত পানি হয়তো জেট স্ট্রিমকে এভাবে আঁকাবাঁকা পথে চলতে বাধ্য করছে। তবে এএমওসি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়া কিংবা উত্তর আটলান্টিকের ওপর বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহের পরিবর্তনও এই স্থানান্তরের কারণ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আমার দৃষ্টিতে এটিই দুর্বল সংযোগ। কারণ এই কোল্ড ব্লব (অতিরিক্ত শীতল অঞ্চল) এবং গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার মধ্যকার সরাসরি সম্পর্ক এখনও পুরোপুরি প্রমাণিত নয়, আর নেপথ্যে অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে। ওল্টম্যানসের মতে, উত্তর আটলান্টিকের এই শীতলীকরণ যদি জেট স্ট্রিমকে প্রভাবিত করতে থাকে, তবে এটি কেবল তাপদাহই নয়, অন্যান্য চরম দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াও ডেকে আনতে পারে।
এ গবেষণাটি ২০২২ সালে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ঘটা এক অভূতপূর্ব ‘ডেরেচো’-এর (এক ধরণের তীব্র বজ্রঝড় ও ক্ষিপ্রগতির বাতাস) সঙ্গেও এর যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে। সেই ঝড়ে বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৬০ মিটারের বেশি ছিল এবং শিলাবৃষ্টিতে ১২ জন প্রাণ হারান। তিনি আরও জানান, কোথাও চরম খরা দেখা দেবে, আবার কোথাও দেখা দেবে প্লাবন। আর এর ওপর ভর করে জলবায়ুর এমন আকস্মিক ওঠানামা আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে