একজন উদ্যোক্তা হিসেবে পথচলা শুরু করার পর একটি প্রশ্নের মুখোমুখি প্রায় সব উদ্যোক্তাকে হতে হয়, আর তা হলো- একটি সফল ব্যবসা দাঁড় করানোর জন্য আসল পুঁজি কোনটি? ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি টাকার ব্যালেন্স নাকি একটি ইউনিক আইডিয়া আর আত্মবিশ্বাস?
ফারজানা আক্তার বলেন, নিজের বাস্তব জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আজ আমি একদম নিঃসংকোচে বলতে পারি, ব্যবসা শুরু করার জন্য বিশাল অঙ্কের আর্থিক মূলধনের চেয়েও বহুগুণ বেশি প্রয়োজন একটি কার্যকর আইডিয়া, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং নিজের ওপর অদম্য বিশ্বাস। এই মূলমন্ত্রের ওপর ভিত্তি করেই মূলত জন্ম নিয়েছিল আমার স্বপ্নের প্রজেক্ট ‘ফার ডেকোর’।
কাঠের সুক্ষ্ম কাজ, নান্দনিক ডিজাইন এবং রুচিশীল ফার্নিচারের মাধ্যমে একটা সাধারণ কিংবা খালি স্থানকে কীভাবে জীবন্ত ও দৃষ্টিনন্দনে বদলে দেওয়া যায়, সেই স্বপ্ন প্রায় দেখতেন ফারজানা। কিন্তু আর দশটা সাধারণ ব্যবসার মতো তার শুরুর গল্পে কোনো বড় আর্থিক ব্যাকআপ ছিল না। পুঁজি বলতে ছিল কেবল সততা, প্রফেশনাল কাজ শেখার প্রবল আগ্রহ, নিজস্ব কিছু ব্যতিক্রমী আইডিয়া এবং কঠিন পরিশ্রম করে নিজেকে প্রমাণের অনড় ইচ্ছা।
ফারজানার জীবনে হঠাৎ করে সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট আসে একটি বিশাল থ্রি স্টার হোটেলের পুরো ফার্নিচার ও ইন্টেরিয়রের কাজ পাওয়ার মাধ্যমে। কোনো বিগ বাজেট কিংবা নিজস্ব বড় কারখানা ছাড়াই কেবল কাজের আইডিয়া এবং গভীর বিশ্বাস ও ভরসায় বড় দায়িত্বটি হাতে পায় সে। ফারজানার কাছে ক্লায়েন্টের এই আস্থাই ছিল জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় পুঁজি। সেই কঠিন কাজটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শেষ করার পর যে মুনাফা হাতে আসে, মূলত সেখান থেকেই তার আর্থিক রোলিং শুরু হয়। এক প্রজেক্টের অর্জিত লাভকে পুনরায় ব্যবসায় খাটিয়ে অল্প অল্প করে ফার ডেকোরকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রবল যুদ্ধ শুরু হয়।
ধীরে ধীরে ব্যবসা যখন গতি পেতে শুরু করে, তখন ফার ডেকোরকে স্বাবলম্বী করতে প্রতিষ্ঠা করা হয় নিজস্ব প্রোডাকশন সেটআপ। বর্তমানে নিজস্ব কারখানা ও অভিজ্ঞ দক্ষ কারিগরদের সমন্বয়ে অত্যন্ত ট্রেন্ডি, আধুনিক, নান্দনিক এবং টেকসই ফার্নিচার তৈরি করা হচ্ছে। দেশের বাজারের সুপরিচিত ও প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডগুলো যেভাবে নিখুঁত উপায়ে পণ্যের কোয়ালিটি নিশ্চিত করে, ফার ডেকোর তাদের কারখানা থেকে প্রতিটি ফার্নিচারে ঠিক সেই সমমানের ফিনিশিং এবং স্থায়িত্ব বজায় রাখে।
তবে ফার ডেকোরের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব বা ইউএসপি হলো তাদের প্রোডাক্টের দাম। যেকোনো নামিদামি ট্র্যাডিশনাল ব্র্যান্ডের একই মানের ফার্নিচার যে মূল্যে বিক্রি হয়, তার তুলনায় আমরা অন্তত ৫০ শতাংশ কম খরচে সেই সমমানের ফার্নিচার গ্রাহকের হাতে তুলে দেই ফার ডেকোর। এতে করে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির প্রোডাক্ট প্রতিটি মানুষের সাশ্রয়ী বাজেটের ভেতরে সুন্দরভাবে চলে আসে।
আজকে ফার ডেকোরের ব্যবসা যে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে, তা এক দিনে বা হুট করে তৈরি হয়নি। একদম শুরুর দিকে কাস্টমার সার্কেল ছিল ভীষণ সীমাবদ্ধ। আমার বন্ধুবান্ধব, কাছের আত্মীয়-স্বজন এবং শুভাকাক্সক্ষীরাই ছিলেন ফার ডেকোরের প্রাথমিক ক্রেতা। তাদের বাসা বা অফিস সাজানোর কাজ দিয়ে যে শুরুটা হয়েছিল, তাদের সন্তুষ্টি এবং ইতিবাচক মন্তব্য ধীরে ধীরে নতুন নতুন ক্লায়েন্ট এনে দিতে সাহায্য করে।
আজকে ফার ডেকোরের পরিচিতি আর শুধু দেশীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বাইরেও। সীমানা পেরিয়ে বিদেশে অবস্থানরত বহু প্রবাসী ও আন্তর্জাতিক কাস্টমার ফার ডেকোরের নিয়মিত ক্লায়েন্ট তালিকায় যুক্ত হয়েছে। অনলাইনের মাধ্যমে তারা সরাসরি যোগাযোগ করেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এই আন্তর্জাতিক কাস্টমারদের অনেকেই সরাসরি পণ্য কখনো দেখেননি, কেবল ইন্টারনেটের মাধ্যমে কাজের ফিনিশিং দেখে ও ফার ডেকোরের সততার ওপর শতভাগ বিশ্বাস রেখে তারা বড় বড় বাজেটের অর্ডার দিয়ে থাকে। তাদের মনের মতো কাস্টমাইজড ফার্নিচার অত্যন্ত যত্নসহকারে তৈরি করে ফার ডেকোর বিদেশের মাটিতেও সফলভাবে ডেলিভারি দিচ্ছে। একটি ছোট্ট আইডিয়া এবং মানুষের ভালোবাসার ওপর ভর করে শূন্য হাতে শুরু হওয়া ফার ডেকোর আজ প্রতিটি মানুষের ভরসার ব্র্যান্ডে রূপ নিচ্ছে। এই বিশ্বাস ও ভালোবাসাই ভবিষ্যৎ দিনগুলোতে আরও নতুন সাফল্য এনে দেওয়ার বড় প্রেরণা পায় ফার ডেকোর।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি