ট্রাম্পের ‘ইকোনমিক ডি-ডে’র পর রিয়ালে ধস, ইরানে ১ ডলারে মিলছে ২০ লাখ রিয়াল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির চাপে রেকর্ড দরপতন হয়েছে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের। দেশটির খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের দাম ছাড়িয়েছে

2026-08-26T17:29:07+00:00
2026-08-26T17:41:30+00:00
 
  বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬,
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ট্রাম্পের ‘ইকোনমিক ডি-ডে’র পর রিয়ালে ধস, ইরানে ১ ডলারে মিলছে ২০ লাখ রিয়াল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৫:২৯ পিএম  আপডেট: ২৬.০৮.২০২৬ ৫:৪১ পিএম
ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দরপতন। ছবি : আল-জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির চাপে রেকর্ড দরপতন হয়েছে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের। দেশটির খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের দাম ছাড়িয়েছে ২০ লাখ রিয়াল। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে ওষুধ, সবকিছুর দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে।

ইরানের মুদ্রা রিয়াল মার্কিন ডলারের বিপরীতে নতুন রেকর্ড দরপতনের মুখে পড়েছে। দেশটির খোলা বাজারে এখন ১ মার্কিন ডলারের দাম ২০ লাখ রিয়ালেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাব, আমদানি-রফতানিতে বাধা এবং দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির কারণে দেশটির অর্থনীতিতে চাপ আরও বেড়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি নানা সংকটের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা রিয়ালের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ দেশটির অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর করেছে।

২০ লাখ রিয়ালে এখন কী পাওয়া যায়?

ইরানে যুদ্ধের আগে ২০ লাখ রিয়াল দিয়ে প্রায় ৪ কেজি টমেটো, আধা কেজি মুরগির মাংস এবং এক লিটারের কিছু কম রান্নার তেল কেনা যেত।

কিন্তু এখন একই পরিমাণ অর্থে এসব পণ্যের প্রায় অর্ধেক পরিমাণ কেনা যাচ্ছে। টমেটোর গড় দাম বেড়েছে ৭১ শতাংশ, মুরগির মাংসের দাম ৭৪ শতাংশ এবং রান্নার তেলের দাম বেড়েছে ১৭৭ শতাংশ।

ওষুধের দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইনসুলিনের দাম ৬৪২ শতাংশ বেড়েছে। প্যারাসিটামলের দাম বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। আর সরকার ভর্তুকি দেওয়ার পরও শিশুর ফর্মুলা দুধের দাম বেড়েছে ৯৫ শতাংশ।

মাস শেষ করাই এখন বড় চিন্তা

মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইরানের পরিবারগুলোকে শুধু কেনাকাটার পরিমাণ নয়, খাবারের তালিকাতেও পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।

তেহরানের ৩৫ বছর বয়সী এক নারী জানান, যুদ্ধের পর তাদের পরিবারের সাপ্তাহিক বাজার খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

তিনি বলেন, আগে তিন বা ছয় মাস পর কী করবেন, তা নিয়ে পরিকল্পনা করা যেত। এখন মাসের আয় দিয়ে মাস শেষ করতে পারাটাই তাদের প্রধান চিন্তা।

স্বামী-স্ত্রী দুজনই কাজ করেন এবং তাদের এক বছরের একটি সন্তান রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডে-কেয়ারে শিশুর দৈনিক খরচ এখন প্রায় ৫ লাখ তোমান বা ৫০ লাখ রিয়াল, যা তাদের জন্য বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইরানে বড় অঙ্কের রিয়াল হিসাব সহজ করতে অনানুষ্ঠানিকভাবে তোমান শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এক তোমান সমান ১০ রিয়াল।

শিশুর ফর্মুলা দুধে সরকারি ভর্তুকি থাকলেও মাসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টিকর সাপ্লিমেন্টের খরচ বীমার আওতায় না থাকায় পরিবারটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, নতুন পোশাক কেনা বা গাড়ি পরিবর্তনের মতো অনেক পরিকল্পনা তারা বাদ দিয়েছেন। শিগগির পরিস্থিতির উন্নতি হবে— এমন আশাও তিনি দেখছেন না।


যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞায় বেড়েছে সবকিছুর দাম

যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন স্থানে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ আমদানি-রফতানির পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এর সঙ্গে রিয়ালের দরপতনের কারণে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়েছে। 

অন্যদিকে, মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি।

২০২৭ সালের মার্চে শেষ হতে যাওয়া বর্তমান ইরানি ক্যালেন্ডার বছরের জন্য সরকার অনুমোদিত ন্যূনতম মজুরি ১৬ কোটি ৬০ লাখ রিয়াল, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ৮২ ডলার। সরকারি সহায়তা ও অন্যান্য সুবিধা যোগ করলেও তা ২২ কোটি রিয়ালের কম, অর্থাৎ ১০৮ ডলারেরও কম।

তেহরানের পুরুষদের পোশাক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ৩৫ বছর বয়সী জামির জানান, গত বছরের তুলনায় তাদের বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। তার আশঙ্কা, শীত শেষ হওয়ার আগেই এই খাতের অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারেন। 

তিনি বলেন, শ্রমিকের মজুরি, কাঁচামালের দামসহ প্রায় সবকিছুর খরচ বেড়েছে। অনেক ব্যবসায়ী লোকসানে গ্রীষ্মের পোশাক বিক্রি করছেন। শরৎ মৌসুমে নতুন করে দাম বাড়ার প্রভাব খুচরা বাজারে আরও স্পষ্ট হবে। 

জামিরের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘর থেকে বের হয়ে আবার বাড়ি ফিরতে কফি, সিগারেট, পানি ও যাতায়াতের মতো খরচেই অন্তত ২০ লাখ তোমান বা ২ কোটি রিয়াল পর্যন্ত ব্যয় হয়ে যেতে পারে। অত্যন্ত হিসাব করে চললেও নিয়মিত বাজার ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ লাখ তোমান খরচ হয়।

আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বাড়ছে

বেতনভোগীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। কারণ মূল্যস্ফীতির কারণে মাসের শুরুতে পাওয়া বেতনের ক্রয়ক্ষমতা পরবর্তী বেতন পাওয়ার আগেই অনেকটাই কমে যাচ্ছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় প্রদেশ হরমোজগানের ২৮ বছর বয়সী সালামা একজন মা ও মৎস্যশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মী। তার পরিবারেও বাজার খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে।

তিনি জানান, আগে সপ্তাহের বাজার করতে প্রায় ৫ লাখ তোমান বা ২৫ লাখ রিয়াল খরচ হতো। এখন একই বাজারের জন্য অন্তত ৫০ লাখ তোমান বা ৫ কোটি রিয়াল প্রয়োজন হচ্ছে।

ফলে মাংস ও মুরগির মতো খাবার কমিয়ে দিতে হয়েছে, এমনকি অনেক সময় পুরোপুরি বাদও দিতে হচ্ছে। 

সালামার আয় বাড়ার পরিবর্তে কমেছে। তাই তাকে আরও কঠোরভাবে খরচ কমাতে হচ্ছে।

তার ভাষ্য, শিশুদের সাধারণ ঠান্ডার ওষুধ বা মৌসুমি অ্যালার্জির ওষুধের দাম এখন প্রায় ৩ লাখ তোমান, অর্থাৎ ১৫ লাখ রিয়াল। আর একজন সাধারণ চিকিৎসকের কাছে যেতে খরচ হয় কমপক্ষে ১০ লাখ তোমান বা ৫০ লাখ রিয়াল।

সংকট আরও কতটা বাড়বে?

ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট শুধু যুদ্ধের কারণে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা ও কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আমদানি-রপ্তানিতে বাধা নতুন করে চাপ তৈরি করেছে।

ফলে দেশটির লাখ লাখ মানুষের কাছে এখন শুধু পণ্যের দাম কত বেড়েছে, সেটিই বড় প্রশ্ন নয়। বরং মাসিক আয় দিয়ে এক মাসের খাবার, বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় পণ্য কতটা কেনা সম্ভব, সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়।

সূত্র : আল-জাজিরা


সময়ের আলো/ইউএমএইচ

  বিষয়:   ট্রাম্প  ইকোনমিক ডি-ডে  রিয়াল  ইরান 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: