প্রতিরক্ষা খাতে বড় পরিবর্তনের পথে ভারত। এতদিন দেশটির সরকারি গবেষণা সংস্থা ডিআরডিওর তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি ও উৎপাদন মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই ছিল। এবার সেই প্রযুক্তি বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছেও দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার। এর ফলে দেশে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশ থেকে অস্ত্র কেনার ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় নয়াদিল্লি।
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের অনুমোদনের পর গত মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) এ সিদ্ধান্তের কথা জানায় দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত যোগ্যতা, সনদ ও সরকারি শর্ত পূরণ করতে পারবে, তারা ডিআরডিওর তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশে উৎপাদন করতে পারবে।
কেন বেসরকারি কোম্পানিকে যুক্ত করছে ভারত?
সহজভাবে বললে, ভারত এখন আরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত তৈরি করতে চায়।
এতদিন ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি তৈরি করত ডিআরডিও, আর বড় পরিসরে উৎপাদনের দায়িত্ব থাকত মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে। ফলে উৎপাদনের গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।
এখন বেসরকারি কোম্পানিগুলোও যুক্ত হলে একাধিক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে উৎপাদন করতে পারবে। এতে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিমাণ ও গতি— দুটিই বাড়তে পারে।
ভারতের আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো বিদেশ থেকে অস্ত্র কেনার ওপর নির্ভরতা কমানো। দেশটি ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নীতির আওতায় নিজেদের প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম যতটা সম্ভব দেশে তৈরি করতে চাইছে।
কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান?
এই সিদ্ধান্তের আওতায় বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। যেমন— ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, অ্যান্টি-রেডিয়েশন ক্ষেপণাস্ত্র, অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং ল্যান্ড-অ্যাটাক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।
অর্থাৎ, শুধু ছোট বা সাধারণ অস্ত্র নয়, তুলনামূলকভাবে জটিল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও তৈরির সুযোগ পাবে বেসরকারি কোম্পানিগুলো।
এতদিন কী করত বেসরকারি কোম্পানিগুলো?
ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য প্রতিরক্ষা খাতে একেবারে নতুন নয়। তারা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, ড্রোন, গোলাবারুদ, সামরিক ইলেকট্রনিকস ও মহাকাশ প্রযুক্তি তৈরির সঙ্গে যুক্ত।
তবে এবার তারা আরও বড় দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অর্থাৎ শুধু যন্ত্রাংশ তৈরি নয়, পুরো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা উৎপাদন ও একীভূত করার কাজেও তারা যুক্ত হতে পারবে।
চীন-পাকিস্তানকে ঘিরে কেন ভারতের এত প্রস্তুতি?
ভারতের সামরিক প্রস্তুতির পেছনে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাও গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বিভিন্ন যুদ্ধ থেকে ভারত বুঝেছে, বড় ধরনের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন হতে পারে। তাই যুদ্ধের সময় দ্রুত নতুন অস্ত্র তৈরি ও মজুত পূরণ করার সক্ষমতা থাকা জরুরি।
এই কারণেই ভারতের কাছে শুধু অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনে দ্রুত বিপুল সংখ্যায় সেগুলো তৈরি করার সক্ষমতাও দরকার।
ভারতের অস্ত্রশিল্প কতটা বড়?
ভারতে বেসরকারি প্রতিরক্ষা শিল্প দ্রুত বাড়ছে। ড্রোন, গোলাবারুদ, সামরিক প্রযুক্তি ও বিমান তৈরিতে বড় বড় দেশীয় কোম্পানি বিনিয়োগ করছে।
জুনে ভারত দেশীয় কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সামরিক ড্রোন কেনার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল। দেশটির ড্রোন শিল্পে ৬০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।
আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেসও উত্তর প্রদেশে গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানায় প্রায় ৩১৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
তবে শুধু কারখানা বানালেই হবে না। ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য বড় বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ কর্মী এবং সরকারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত অর্ডার প্রয়োজন।
ভারতের হাতে কী কী ক্ষেপণাস্ত্র আছে?
ভারতের হাতে বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এর কয়েকটি পারমাণবিক অস্ত্র বহনেও সক্ষম।
এর মধ্যে অগ্নি-৫ অন্যতম শক্তিশালী। এর পাল্লা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। এছাড়া অগ্নি-৪-এর পাল্লা প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার।
অন্যদিকে ভারত ও রাশিয়ার যৌথভাবে তৈরি ব্রহ্মোস একটি শক্তিশালী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এর পাল্লা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত।
শুধু নিজের জন্য নয়, অস্ত্র বিক্রিও করছে ভারত
ভারত এখন নিজেদের সামরিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি অন্য দেশেও অস্ত্র বিক্রি বাড়াচ্ছে। দেশটির সামরিক রফতানি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মাত্র ৭২ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ইতোমধ্যে ফিলিপাইনের কাছে বিক্রি করেছে ভারত। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও এ ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে চুক্তি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও ব্রহ্মোস দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি।
তাহলে কি ভারত বড় সামরিক শক্তি হতে চাইছে?
ভারতের এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো একটি বড় ও শক্তিশালী দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানিগুলোও যদি বড় পরিসরে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে, তাহলে ভারতের উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বাড়বে। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানির প্রয়োজন কিছুটা কমতে পারে এবং ভবিষ্যতে অস্ত্র রফতানিও বাড়ানো সম্ভব হবে।
তবে ভারত এখনো পুরোপুরি বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বড় অস্ত্র আমদানিকারক ছিল। এই সময়ে ভারতের আমদানি করা অস্ত্রের প্রায় ৪০ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে, ২৯ শতাংশ ফ্রান্স থেকে এবং ১৫ শতাংশ ইসরায়েল থেকে।
গোপন ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি বেসরকারি হাতে দেওয়া কতটা নিরাপদ?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বেসরকারি কোম্পানির হাতে এসব প্রযুক্তি গেলে তথ্য ফাঁস বা সাইবার হামলার ঝুঁকি থাকতে পারে।
তবে ভারতের যেসব বড় কোম্পানি এই ধরনের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা খাতে কাজ করছে। তাদের গোপনীয়তা রক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
ভারতের এই সিদ্ধান্তকে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এর মাধ্যমে ভারত একদিকে নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভবিষ্যতে বিশ্বের বড় অস্ত্র উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশগুলোর কাতারে যেতে চাইছে।
সূত্র : আল-জাজিরা
সময়ের আলো/ইউএমএইচ