যুক্তরাষ্ট্র ‘স্টেট স্পনসরস অব টেররিজম’ বা সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকা থেকে সিরিয়াকে সরিয়ে দিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের এই কালো তালিকায় এখন রয়েছে তিনটি দেশ কিউবা, ইরান ও উত্তর কোরিয়া।
সিরিয়াকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার ভাষায়, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশটি একটি ‘অন্ধকার অধ্যায়’ পেছনে ফেলে উন্নয়ন, পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেল।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জুলাইয়ে সিরিয়াকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কংগ্রেসের ৪৫ দিনের পর্যালোচনা শেষে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়।
সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকলে বিদেশি সহায়তা, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি, নির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেন এবং সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য দ্বৈত-ব্যবহারের পণ্য স্থানান্তরের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ হয়। একই সঙ্গে আইনি ও নিয়ন্ত্রক ঝুঁকির কারণে ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো ওই দেশের সঙ্গে ব্যবসা করতেও অনাগ্রহী হয়ে পড়ে।
সিরিয়াকে কেন তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলো?
১৯৭৯ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে ইসরায়েলবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহযোগিতার অভিযোগ এনে সিরিয়াকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
২০০০ সালে হাফেজ আল-আসাদের মৃত্যুর পর তার ছেলে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতায় এলেও সিরিয়ার অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদ্রোহীদের হাতে বাশার সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত দেশটির তালিকায় ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছিলেন, সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সহায়তা না দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা দেওয়ার পরই দেশটিকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ ছাড়া সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আইএসআইএল বা আইএসবিরোধী সহযোগিতাকেও ওয়াশিংটন ইতিবাচকভাবে দেখছে। সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা অতীতে আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত আল-নুসরা ফ্রন্টের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তবে ২০১৬ সালে তিনি ওই সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
সিরিয়াকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ফলে দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক সিনা আজোদি বলেন, এর ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থায় সিরিয়ার প্রবেশ সহজ হতে পারে। এতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পর্কও আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্রের তালিকায় এখন কোন দেশগুলো?
সিরিয়াকে বাদ দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্টেট স্পনসরস অব টেররিজম’ তালিকায় রয়েছে ইরান, কিউবা ও উত্তর কোরিয়া।
ইরান
১৯৮৪ সাল থেকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকায় রয়েছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহযোগিতা করে। এর মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী এবং ইরাক ও সিরিয়ায় সক্রিয় বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে।
এই তালিকাভুক্তির ফলে ইরানের সরকার, আর্থিক ব্যবস্থা, সামরিক খাত ও তেলশিল্পের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
কিউবা
১৯৫৯ সালের কিউবান বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ। ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী প্রেসিডেন্ট ফুলহেনসিও বাতিস্তার পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি ঘটে।
১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবার কিউবাকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকায় রাখে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, হাভানা বিভিন্ন সশস্ত্র বিপ্লবী গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছে।
২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে কিউবাকে তালিকা থেকে সরিয়ে দেন। কিন্তু ২০২১ সালে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে আবার কিউবাকে তালিকায় ফিরিয়ে আনেন।
জো বাইডেন প্রশাসন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কিউবাকে আবার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
উত্তর কোরিয়া
১৯৮৭ সালে কোরিয়ান এয়ারের একটি বিমান বিস্ফোরণে ১১৫ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার ভূমিকার অভিযোগ ওঠার পর ১৯৮৮ সালে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকায় রাখা হয়।
২০০৮ সালে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন দেশটিকে তালিকা থেকে সরিয়ে দেয়। তবে ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে উত্তর কোরিয়াকে আবার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বর্তমানে দেশটির পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, অস্ত্র বিস্তার এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তর কোরিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
আর কোন দেশগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায়?
সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রের তালিকার বাইরে আরও অনেক দেশ, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
রাশিয়া ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। তবে যুদ্ধ শুরুর পর বিভিন্ন মার্কিন আইনপ্রণেতা রাশিয়াকে ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’ ঘোষণার দাবি তুললেও ওয়াশিংটন এখনো দেশটিকে সেই তালিকায় নেয়নি।
এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার ওপরও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও তেলশিল্প বিশেষভাবে এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ভেনেজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞার অন্যতম উদ্দেশ্য অবৈধ মাদক ব্যবসা মোকাবিলা করা। দেশটির প্রধান রপ্তানি পণ্য তেল হওয়ায় তেল পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর ওপরও বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন।
ফলে সিরিয়াকে তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি ও নিষেধাজ্ঞার কাঠামোয় তিনটি দেশ—ইরান, কিউবা ও উত্তর কোরিয়া, এখনো ‘স্টেট স্পনসরস অব টেররিজম’ তালিকায় রয়ে গেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ