নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী হিমালয় এলাকায় বুধবার ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। প্রবল পানির স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ভেসে গেছে। বন্যার প্রভাবে তিব্বতের সঙ্গে নেপালের গুরুত্বপূর্ণ স্থল যোগাযোগও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আসলে কী ঘটেছে?
নেপালের রসুয়া জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় হঠাৎ করেই পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানি নেমে আসে। প্রবল স্রোত রাস্তা, সেতু, বাড়িঘর ও বিভিন্ন অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। রসুয়া জেলার শ্যাপ্রুবেশি ও তিমুরে এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বন্যার পাশাপাশি ভূমিধসে চীন-নেপাল সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ জিরং বন্দর এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, কাদামাটি ও পানির বিশাল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে স্থাপনা ও যানবাহন ঢেকে ফেলছে।
কী কারণে এত ভয়াবহ বন্যা হলো?
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একটি ভূমিকম্পের প্রভাবে লেন্দে খোলা নদীর ওপর বরফ ও পাথরের মিশ্রণে বড় ধরনের ধস বা তুষারধস নামে। এতে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে বিপুল পরিমাণ পানি জমে যায়। পরে সেই বাধা ভেঙে পানি প্রবল বেগে নিচের দিকে নেমে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে দুর্যোগটির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টি তদন্ত করে দেখছেন।
কত মানুষ নিখোঁজ?
নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময় ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে অন্তত ৩৮৪ জন ভ্রমণকারী নিখোঁজ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে নেপালি ও বিভিন্ন দেশের বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। ভারতীয়, ব্রিটিশ, মালয়েশীয়, দক্ষিণ কোরীয়, দক্ষিণ আফ্রিকান, মার্কিন, অস্ট্রেলীয় ও ডাচ নাগরিকদেরও নিখোঁজের তালিকায় থাকার কথা জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া চীনের তিব্বত অংশেও বহু মানুষ নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ফলে পুরো সীমান্ত অঞ্চলে নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিপদ কি এখনো আছে?
উদ্ধারকর্মীদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, লেন্দে খোলা নদীর উজানে এখনো পানির প্রবাহ আটকে থাকতে পারে। ফলে নতুন করে বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে নদীর তীরবর্তী ও নিচু এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর পানি ভারতের সমতল এলাকাতেও প্রবাহিত হওয়ায় বিহার ও উত্তর প্রদেশে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
উদ্ধারকাজ কত দূর এগিয়েছে?
নেপাল পুলিশ, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল দুর্গত এলাকায় তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। তবে প্রবল স্রোত, কাদা ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় পানির উচ্চতা বেশি থাকায় হেলিকপ্টারও অবতরণ করতে পারছে না।
চীনও সীমান্তবর্তী এলাকায় শত শত উদ্ধারকর্মী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে। কিন্তু ঘন কাদা, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক এবং প্রতিকূল আবহাওয়া উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলছে।
সীমান্ত যোগাযোগে বড় ধাক্কা
বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জিরং বন্দর এলাকায় সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে।
দুর্যোগের কারণে বহু মানুষ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পানি ও কাদার স্তর কমলে দুর্গত এলাকায় আরও ব্যাপকভাবে তল্লাশি চালানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নদীর তীরবর্তী মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ