২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস, দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করা এবং তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমানো। প্রথম দিনের হামলাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এরপর ইরান পাল্টা-হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, ইসরাইল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে যুদ্ধকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ছয় মাস পরও যুদ্ধ শেষ হয়নি। বরং সরাসরি বিমান হামলা থেকে সংঘাতটি এখন পরিণত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক, সামরিক ও জ্বালানি যুদ্ধে। বিশ্লেষকদের চোখে বর্তমান পরিস্থিতি একটি ‘ব্যয়বহুল অচলাবস্থা’। কেউই স্পষ্ট বিজয় অর্জন করতে পারেনি, আবার কেউ পিছু হটার অবস্থাতেও নেই।
প্রাণহানি প্রায় ৮ হাজার : ছয় মাসের যুদ্ধে প্রাণহানির পরিমাণ ভয়াবহ। সবশেষ সরকারি তথ্যের সমন্বিত হিসাবে ইরানে অন্তত ৩ হাজার ৫২৭ জন, লেবাননে ৪ হাজার ৩৫০ জন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে আরও ২৮ জন নিহত হয়েছেন। ইরানি হামলায় নিহত হয়েছেন ৬০ ইসরাইলি এবং ১৮ মার্কিন সেনাসদস্য। আহত মার্কিন সামরিক সদস্যের সংখ্যা ৭৫৭। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা অন্তত ৭ হাজার ৯০০।
তবে এই সংখ্যা চূড়ান্ত নয়। যুদ্ধ চলমান থাকায় হতাহতের হিসাব নিয়মিত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান ও লেবাননে ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা হতাহত এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি সম্পূর্ণভাবে হিসাবের আওতায় এসেছে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
৫ হাজারের বেশি হামলা : ছয় মাসে যুদ্ধটি যে কতটা বিস্তৃত হয়েছে, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় হামলার হিসাব থেকে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর অন্তত ৩ হাজার ৫৮০টি হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২ হাজার ৫৩টি হামলা চালিয়েছে। অর্থাৎ মোট হামলার সংখ্যা ৫ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে।
যুদ্ধের আগুন ইরানের সীমানায় আটকে থাকেনি। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথিসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ইরানি হামলার লক্ষ্য হয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা। ফলে যুদ্ধটি দ্রুত একটি বহুমাত্রিক আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হয়।
পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে : ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করাই ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় পারমাণবিক বিজ্ঞানীও নিহত হয়েছেন।
মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে যুদ্ধের আগে যেখানে ইরানের সম্ভাব্য ‘ব্রেকআউট টাইম’- অর্থাৎ পারমাণবিক বোমার জন্য প্রয়োজনীয় ফিসাইল উপাদান তৈরির সময় ছয় মাসের মতো ধরা হয়েছিল, মে মাসের হিসাবে তা বেড়ে প্রায় এক বছর হয়েছে। কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন করতে পারছে না। ফলে ২০২৫ সালের হামলার পর থেকে ইরানের প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ পারমাণবিক কর্মসূচি কতটা ধ্বংস হয়েছে এবং কতটা সক্ষমতা ইরান ধরে রেখেছে- এ প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখনও নেই।
হরমুজ এখন যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু : ছয় মাসের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক প্রভাব এসেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বব্যাপী তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দেয়।
যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক জাহাজ এই পথে চলাচল করত, যুদ্ধের ছয় মাসে গড়ে মাত্র সাতটি জাহাজ প্রতিদিন হরমুজ অতিক্রম করেছে। জুনের একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির পর দৈনিক চলাচল সাময়িকভাবে ২০টিতে উঠলেও তা স্বাভাবিক সময়ের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ। পরে মার্কিন অবরোধ পুনরায় জোরদার হলে চলাচল আবার কমে যায়।
শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের হিসাবে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত হরমুজে জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে ৭০টি নিশ্চিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৯ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
তেল ও জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা : যুদ্ধের শুরুতেই আশঙ্কা ছিল, হরমুজ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে। তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। তবে বড় মজুদ, উপসাগরের বাইরে অতিরিক্ত উৎপাদন এবং চীনের তেল আমদানি কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজার তাৎক্ষণিক বিপর্যয় এড়াতে সক্ষম হয়েছে।
তারপরও যুদ্ধের আগের তুলনায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি, ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিশোধন ক্ষমতা রফতানি বিঘ্নের কারণে অচল। ফলে অপরিশোধিত তেলের চেয়ে পরিশোধিত জ্বালানির সংকট এখন বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত এক বছরে গ্যাসোলিনের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। যুদ্ধের আগে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ ধরা হলেও এখন তা ৩ শতাংশ প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
ইরান ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু ভেঙে পড়েনি : সামরিকভাবে ইরান বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের হিসাবে, শত শত ইরানি নৌযান ধ্বংস হয়েছে এবং দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ অকার্যকর হয়েছে। ইরানের বিমানবাহিনীর কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে কমেছে। তবে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে ইরানের তেল রফতানি যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৮৫ শতাংশ কমে আগস্টে দিনে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে নেমেছে। জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল বছরে ১২৮ শতাংশ। অন্য এক হিসাবে জুলাইয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়।
তবু সরকার টিকে আছে। বরং বহিরাগত হামলা ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও কঠোর করেছে। ফলে সামরিক হামলা ও অর্থনৈতিক অবরোধ- কোনোটিই এখন পর্যন্ত তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি।
বেকায়দায় যুক্তরাষ্ট্রও : যুদ্ধের মূল্য শুধু ইরানকে দিতে হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপরও পড়ছে বড় চাপ। ছয় মাসে ১৮ মার্কিন সেনা নিহত এবং ৭৫০-এর বেশি আহত হয়েছেন। মার্কিন বাহিনী বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে। জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তার প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ৬৫ শতাংশ এবং থাড ইন্টারসেপ্টরের অন্তত ৩৮ শতাংশ ব্যবহার করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিন যুদ্ধ চললে ইউরোপ ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সামনে কী দেখা যাচ্ছে : ছয় মাস পর যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো- কেউ জয়ী হয়নি, কিন্তু কেউ হারও মানেনি। যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি সামরিক হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধকে গুরুত্ব দিচ্ছে। নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের প্রধান কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ধরে রেখেছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চলছে। হরমুজ পুনরায় স্বাভাবিক করার জন্য মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো সক্রিয় হয়েছে। কিন্তু মূল বিরোধ- ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মার্কিন নৌ অবরোধ এবং হরমুজের নিয়ন্ত্রণ- কোনোটিরই স্থায়ী সমাধান হয়নি।
ফলে ছয় মাসের যুদ্ধ এখন আর দ্রুত বিজয়ের যুদ্ধ নয়; এটি হয়ে উঠেছে সহনশক্তির লড়াই। ইরান অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে চাপে, আর মধ্যপ্রাচ্য জ্বালানি ও নিরাপত্তা সংকটে আটকে আছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ- যদি কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে এই অচলাবস্থা ২০২৭ সাল পর্যন্তও গড়াতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও