নেপালের ত্রিশুলির একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন সেনাসদস্যরা। গত দুদিন ধরে সেখানে অন্তত ১০০ জন আটকা আছেন। শুক্রবার তাদেরকে উদ্ধার চেষ্টার মধ্যেই নতুন করে বন্যার সতর্কতা জারি হয়েছে। তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি হ্রদের বাঁধ ধসে যাওয়ার খবরে নেপাল ও চীন উভয়ই উদ্ধারকর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলেছে।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত এএফপিকে বলেন, ‘ত্রিশুলি-৩-এ’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে আটকে পড়াদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। সেখানে দুটি হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছে। কিন্তু টানেলের প্রবেশপথগুলো কোথায়, তা শনাক্ত করা যাচ্ছে না। রাজা রাম জানান, টানেল এলাকা থেকে এরই মধ্যে প্রায় ৩৫০ জন শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে সেখানকার একটি অংশে আরও ১০০ জনের বেশি মানুষ আটকে আছে।
গত বুধবার সুনামির মতো পানি ও কাদার বিশাল স্রোত নেমে এসে নেপাল-তিব্বতের অনেক বসতবাড়িকে মাটিচাপা দিয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো এখন পর্যন্ত ৪৭২টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। হিমালয়ে ট্রেকিংয়ে যাওয়া পর্যটক এবং তিব্বতের কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া বহু হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ আছেন। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর এটিই নেপালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্যোগ।
এদিকে হিমবাহ ধসের সময় বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ পানি জমে হ্রদের মতো জলাধার তৈরি হয়েছে। শুক্রবার তিব্বতে এমন একটি জলাধার ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে বন্যার সতর্কতা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ।
এতে ওই এলাকায় জীবিতদের সন্ধানে কাজ করা উদ্ধারকর্মীরাও ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। নেপাল পুলিশ সব উদ্ধারকর্মীকে অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পুলিশ বলেছে, তারা ‘তিব্বতের অংশে আবারও একটি পানি ধরে রাখার বাঁধ ভেঙে যাওয়ার’ তথ্য পেয়েছে। চীনের কর্তৃপক্ষও তিব্বতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় গিরং এলাকার উদ্ধার অভিযান স্থগিত করেছে। বুধবারের বন্যায় এলাকাটিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে।
বাঁধ ভাঙার খবরে ব্যাহত উদ্ধার অভিযান : হিমবাহ ধসের সময় পাহাড়ের ঢালে ধ্বংসস্তূপ জমে একটি বাঁধ তৈরি হয়েছিল। গত দুদিনে সেখানে জমতে থাকা পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে। এমন খবর পেয়ে সীমান্ত এলাকায় নিখোঁজদের উদ্ধার অভিযান স্থগিত করেছে নেপাল ও চীনের কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার থেকেই এই বাঁধটি ধসে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
শুক্রবার নেপালের পুলিশ এক বিবৃতিতে জানায়, ‘তিব্বতের অংশে আবারও একটি পানি ধরে রাখার বাঁধ ভেঙে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।’ এরপর উদ্ধারকারীদের উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
চীনের কর্তৃপক্ষও একই তথ্য জানিয়েছে। তারা বলেছে, তিব্বত-নেপাল সীমান্তে ভয়াবহ বন্যার পর যে হ্রদটি তৈরি হয়েছিল, সেটি উপচে পড়তে শুরু করেছে। এতে উদ্ধার অভিযান স্থগিত করতে তারা বাধ্য হয়েছেন।
হ্রদটি তৈরি হয়েছে তিব্বত সীমান্তের গিরং বাণিজ্যকেন্দ্রের কাছে। সেখানে কী পরিমাণ পানি জমে আছে তা বোঝার উপায় নেই। তবে সতর্কতার অংশ হিসেবে দুর্গত এলাকায় থাকা উদ্ধারকারীদের অন্তত এক কিলোমিটার দূরে সরে যেতে বলেছে চীনের কর্তৃপক্ষ। দেশটির সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত ৪৯৯ জন চীনা নাগরিক ও ৫৫৫ জন বিদেশিকে দুর্গত এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার আকস্মিক বন্যার কারণে দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় কয়েকশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিধ্বস্ত হয়েছে বসতবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এখনও দেড় হাজারের মতো মানুষ নিখোঁজ আছেন। এর মধ্যেই আরেক দফায় পাহাড়ি ঢলের সতর্কতা জারি হলো। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং শুক্রবার তিব্বতে উদ্ধার অভিযান নিয়ে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছেন।
আলোচনার বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, আশপাশের এলাকায় হিমবাহ, এ থেকে সৃষ্ট হ্রদ ও ভূতাত্ত্বিক দুর্যোগের এখনও অনেক অদৃশ্য ঝুঁকি আছে। ফলে উদ্ধারকাজ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।