মর্গেও হচ্ছে না ঠাঁই

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

নেপালের উত্তর সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় বুধবার সকালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ভোতেকোশি নদীর তীরবর্তী জনপদ লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। নেপাল-চীন সীমান্তের তিমুরে

2026-08-29T00:29:02+00:00
2026-08-29T00:29:02+00:00
 
  শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬,
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
মর্গেও হচ্ছে না ঠাঁই
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৯ এএম 
২৮ আগস্ট নেপালের নুওয়াকোট জেলায় আকস্মিক বন্যা থেকে উদ্ধার হওয়ার পর কাঁদছেন এক নারী। ছবি : কাঠমান্ডু পোস্ট
নেপালের উত্তর সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় বুধবার সকালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ভোতেকোশি নদীর তীরবর্তী জনপদ লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। নেপাল-চীন সীমান্তের তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় বন্যার পানির সঙ্গে নেমে আসা ঢল ও ধ্বংসাবশেষে সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিধ্বস্ত হয়েছে। তিন দিন পরও নিখোঁজদের সন্ধানে নদীতীর ও ভাটির জনপদগুলোতে উদ্ধার অভিযান চলছে। নেপালের এক স্বাস্থ্য অধিকর্তা সুশীল আরিয়ালের তথ্য অনুযায়ী- এই মুহূর্তে মর্গে ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দেহ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তা ১০ থেকে ১৪ দিন রাখা যাবে। তারপর আর রাখা সম্ভব নয়। বিবিসি, রয়টার্স, আলজাজিরা

নেপালের হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা ৫০০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। শুক্রবার সকালে সে দেশের সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট ৫ শতাধিক মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছে। তবে বিপর্যয়-পরবর্তী অন্য সংকটে দিশাহীন নেপাল সরকার। এত দেহ উদ্ধার হচ্ছে যে, তা রাখার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। উপচে পড়ছে মর্গ, হাসপাতাল। খুব বেশি দিন দেহ সংরক্ষণ করে রাখার পরিষেবাও নেই সেখানে।

গত বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলায় ভোটেকোশী নদীতে হড়পা বান আসে। তিব্বত সীমান্তের কাছে গ্রামের পর গ্রাম ভেসে যায় নদীর জল ও কাদামাটির প্রবল স্রোতে। তারপর থেকে উদ্ধারকাজ চলছে। প্রতিদিনই বহু দেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। তবে সেগুলো সংরক্ষণ করে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে একাধিক মর্গ ভরে গেছে। অন্যত্র অস্থায়ীভাবে দেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে তা কত দিন রাখা যাবে, নিশ্চিত নয়।

জলের তোড়ে ভেসে কয়েক কিলোমিটার দূরে চলে গেছে দেহ। ফলে মৃতের পরিচিত যদি দেহ শনাক্ত করতে আসতে চান, তাকে অনেক পথ পেরোতে হবে। তার জন্য সময় লাগবে। নেপালের পোখরা একাডেমি অব হেল‌থ সায়েন্সের অধিকর্তা সুশীল আরিয়াল জানিয়েছেন, এই সময়ের মধ্যে পরিচিত কেউ এসে দেহ শনাক্ত না করলে তা সৎকার করে ফেলতে হবে। সে ক্ষেত্রে অশনাক্ত দেহগুলোর গণসৎকার শুরু করবে নেপাল সরকার। এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী আর বিকল্প উপায় নেই।

অনেক দেহ অবশ্য সৎকার করা হয়েছে। তবে অশনাক্ত দেহের সংখ্যাই বেশি। এখনও প্রায় ১৫০০ জন নিখোঁজ। এ বিষয়ে চিতওয়ান জেলার সরকারি আধিকারিকেরা বৃহস্পতিবার একটি বৈঠক করেন। ওই জেলায় যত মর্গ রয়েছে, সব মিলিয়ে সেখানে ৩০ থেকে ৫০টি দেহ একবারে সংরক্ষণ করা সম্ভব। সেগুলো আগেই ভরে গেছে। নতুন করে ওই জেলাতেই উদ্ধার হয়েছে ১৩৭টি দেহ। কিছু পরিত্যক্ত ভবন শনাক্ত করে সেখানে অস্থায়ীভাবে আরও ২৫০ দেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন কর্তৃপক্ষ। 

মরদেহ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক, শুকনো বরফ সংগ্রহেও হিমশিম খাচ্ছে নেপাল। ইতিমধ্যে নিখোঁজ অনেকের পরিজনরা মর্গে ভিড় করতে শুরু করেছেন। পরিচিতের ছবি হাতে তারা কর্তৃপক্ষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন। এর মধ্যে নেপালে ফের হড়পা বানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মানস সরোবরে নিখোঁজ ভারতীয় দম্পতি : আমেরিকা থেকে নেপাল পৌঁছেছিলেন আমেরিকাপ্রবাসী ভারতীয় বংশোদ্ভূত দম্পতি দীপক এবং মধু আহুজা। দীপকের ৬০তম জন্মদিন ছিল এবার। পরিবার সূত্রে জানা যায়, এই জন্মদিন তিনি কৈলাস-মানস সরোবর ভ্রমণের মধ্যে দিয়েই কাটাতে চেয়েছিলেন। তাই স্ত্রী মধুকে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে  গিয়েছিলেন নেপাল। কৈলাসযাত্রা শেষ করে বুধবার আহুজা দম্পতি গিরং পোর্টের অভিবাসন দফতরের কাছে পৌঁছান। চীনের স্থানীয় সময় তখন সকাল ৯টা। 

ঠিক সেই সময়েই সেখানে বিপর্যয় নেমে আসে। হড়পা বানে ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যায় গিরং পোর্টের বেশিরভাগ অংশই। আহুজাদের দুই কন্যা শ্রেয়া এবং আসনা জানিয়েছেন, তারপর থেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এখন উৎকণ্ঠায় গোটা আহুজা পরিবার এবং তাদের আত্মীয়রা।

কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৪৭৫ জনের। শ্রেয়াদের বিশ্বাস, তাদের বাবা-মা চীন সীমান্তের দিকেই রয়েছেন। 

এনডিটিভিকে শ্রেয়া বলেন, বাবা-মা কৈলাসযাত্রা শেষ করে তিব্বত-নেপাল সীমান্তে পৌঁছেছিলেন। গিরং সীমান্ত থেকেই শেষ কথা হয়েছিল। তার পরই শুনলাম হড়পা বান নেমে এসেছে।

শ্রেয়া আরও বলেন, বাবা-মা খুব উৎফুল্ল ছিলেন কৈলাসযাত্রা নিয়ে। গত ৪ আগস্ট ছিল বাবার জন্মদিন। তাই বাবাই বলেছিল, এ বার জন্মদিনটা কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রাতেই কাটাবেন। উল্লেখ্য, বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তে নেমে আসে বিপর্যয়। হড়পা বানে নেপালের একের পর এক গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। চারদিকে শুধু ধ্বংসলীলার ছবি।

৫০০ মিটার পাহাড়ে উঠে প্রাণে বাঁচলেন তারা  : কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে সাসপেন্ড হতে পারেন- এমন আশঙ্কা মুহূর্তের জন্য মনে উঁকি দিয়েছিল রাজু বুধাথোকির। কিন্তু বিপদ বুঝে শেষ পর্যন্ত সেই চিন্তা দূরে সরিয়ে পাহাড়ের দিকে ছুটেছিলেন তিনি। আর তাতেই বেঁচে গেলেন নেপালের রাসুয়া জেলার তিমুর বাজারের শুল্ক দফতরের এই কর্মী।

বুধবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন রাজু। হঠাৎ পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠতে শুরু করে। প্রথমে ভূমিকম্প মনে হলেও বাইরে বেরিয়ে দেখেন চারদিকে হুলস্থুল। আকাশ কালো হয়ে গেছে, দূর থেকে ভেসে আসছে বিকট শব্দ। অদূরের একটি পুলিশ চৌকির দিকে ছুটে গেলেও সেখানে গিয়ে দেখেন, পুলিশ সদস্যরাও প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছেন।

পেছনে তাকিয়ে রাজু দেখেন, তিমুর বাজারের বাড়িঘর ও দোকানপাট প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। ভোতেকোশি নদীর উত্তাল জলস্রোত গ্রাস করছে বড় বড় ভবনও। আর দেরি না করে পাহাড়ের দিকে ছুটতে শুরু করেন তিনি।

পুলিশ পোস্টের তারের বেড়া পার হওয়ার সময় হাতে চোট পান রাজু। তবু থামেননি। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিটার উঁচুতে পাহাড়ের একটি জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেন।

রাসুয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাজু কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে তিমুরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সব শেষ।

হড়পা বানের পর তার অনেক সহকর্মী ও প্রতিবেশী নিখোঁজ রয়েছেন জানিয়ে রাজু বলেন, কখনো ভাবিনি এভাবে জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ পাব। এখন সবকিছুই ভয়ংকর এক দুঃস্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে।

পাহাড়েই কাটল আতঙ্কের রাত : রাজুর মতো তিমুর বাজারের কাস্টমস দফতরের আরেক কর্মী গৌতমও প্রাণ বাঁচাতে পাহাড়ে আশ্রয় নেন। হড়পা বানের পর উদ্ধার না পাওয়া পর্যন্ত তাকেও অন্যদের সঙ্গে সেখানেই থাকতে হয়।

গৌতম বলেন, বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার থেকে ফেলে দেওয়া নুডলসের প্যাকেট খেয়ে কোনোভাবে রাত পার করেছিলেন তারা। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে আরেকটি হেলিকপ্টার এসে তাদের বিদুরে নিয়ে যায়।

হেলিকপ্টারে ওঠার পরই প্রথমবারের মতো বেঁচে থাকার স্বস্তি অনুভব করেন গৌতম। তার ভাষায়, সত্যিই আমি বেঁচে গেছি। কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন জীবন পেয়েছি।

চোখের সামনে ভেসে গেল পরিবার : নুয়াকোট জেলার বাসিন্দা কল্পনা মল্লা হারিয়েছেন পরিবারের সদস্যদের। বিবিসিকে তিনি বলেন, আমার চোখের সামনেই পরিবারের সবাইকে বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল।

বাবা, মা, বোন ও বোনের সন্তানদের বাঁচানোর কোনো সুযোগই পাননি কল্পনা। তিনি বলেন, এই প্লাবন আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে। কেবল আমি আর আমার ছেলে ঘরের ছাদে উঠে কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়েছি।

কল্পনার ছেলে সুগম মল্লা জানান, বিপদের মুহূর্তে মায়ের হাত টেনে ধরে তাকে রক্ষা করেন তিনি। যোগাযোগের জন্য নিজের মোবাইল ফোনটি বোনের কাছে দিয়েছিলেন সুগম। কিন্তু এখন সেটি আর বাজছে না। তার আশঙ্কা, বোন হয়তো বন্যার স্রোতে ভেসে গেছেন।

আরেক বাসিন্দা গোমা পণ্ডিত হারিয়েছেন গবাদিপশু ও আবাদি জমি। তিনি বলেন, আমার সব মোষ ও গবাদিপশু ভেসে গেছে। ১০ বস্তা সরিষা, টনকে টন ভুট্টা আর ধান- সব শেষ। কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   মর্গ  ঠাঁই 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: