একসঙ্গে খেলেছেন, ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেটে সময় কাটিয়েছেন, আবার ১৯৯২ বিশ্বকাপে গড়েছেন পাকিস্তানের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় জুটি। সেই দীর্ঘদিনের সতীর্থ ইমরান খানের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে এবার আবেগ সামলাতে পারলেন না জাভেদ মিয়াঁদাদ। কারাবন্দী সাবেক পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে একপর্যায়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন পাকিস্তানের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান।
পাকিস্তানের সাংবাদিকদের প্ল্যাটফর্ম ‘ন্যারেটিভস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইমরানের মুক্তির পক্ষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন মিয়াঁদাদ। তাঁর দাবি, চলমান সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত আলোচনার মাধ্যমে। ইমরানকে তিনি বর্ণনা করেছেন ‘সৎ মানুষ’ ও ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে।
ইমরানের সঙ্গে নিজের দীর্ঘ ক্রিকেটীয় সম্পর্কের কথা তুলে ধরে মিয়াঁদাদ বলেন, ‘কেউ আমাকে এটা বুঝিয়ে বলুন। সে কি পাকিস্তানকে খেয়ে ফেলবে? আমরা সবাই পাকিস্তানি। একসঙ্গে বসে বিষয়টি সমাধান করা উচিত। সমস্যা যা-ই হোক, পাকিস্তানের এখন সেটিই প্রয়োজন। পরিস্থিতিকে অযথা দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে, এটা ঠিক নয়।’
ইমরানের সঙ্গে তাঁর কোনো শত্রুতা ছিল, এমন ধারণাও নাকচ করে দিয়েছেন ৬৯ বছর বয়সী মিয়াঁদাদ। তিনি বলেন, ‘কোনো শত্রুতা ছিল না। আমাদের মধ্যে কোনো ঝগড়াও হয়নি।’
ইংল্যান্ডে ইমরানের সঙ্গে কাউন্টি ক্রিকেট খেলার স্মৃতিও মনে করেছেন পাকিস্তানের সাবেক এই অধিনায়ক। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা একসঙ্গে কাউন্টি ক্রিকেটও খেলেছি। ইংল্যান্ডে ছয় মাস একসঙ্গে ছিলাম। পরে পাকিস্তান দলে আমি তাকে অধিনায়কত্বও দিয়েছিলাম। আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল এবং আমরা একসঙ্গে ক্রিকেটের একটি দারুণ সময় কাটিয়েছি।’
সতীর্থ ইমরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আক্ষেপ করে মিয়াঁদাদ বলেন, ‘প্রায়ই আমার মনে হয়, বেচারা কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে? আমরা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। একসঙ্গে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছি, সময় কাটিয়েছি এবং একে অপরকে খুব ভালোভাবে বুঝতাম। একসঙ্গে আমরা পাকিস্তানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছিলাম।’
তবে অবসর-পরবর্তী সময়ে ইমরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালনা নিয়ে মিয়াঁদাদ অতীতে সমালোচনা করেছেন। সেই কারণে সময়ের সঙ্গে দুজনের সম্পর্কেও কিছুটা তিক্ততা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এবার তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইমরানকে নিয়ে অতীতের মন্তব্যও তিনি নিজের বিশ্বাস থেকেই করেছিলেন। একই সঙ্গে পাকিস্তানের জন্য ইমরানের অবদান ভুলে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মিয়াঁদাদ বলেন, ‘যা ভুল, তা ভুলই। অবশ্যই সে একজন জাতীয় বীর। আমি প্রার্থনা করি, এই সমস্যার সমাধান হোক। আমি পাকিস্তান সরকারের কাছেও আবেদন জানাচ্ছি। হয়তো অনেক কিছু বলার অবস্থানে আমি নেই, তবে এটুকু বলতে পারি সে আমার সহকর্মী। আমরা অনেক সময় একসঙ্গে কাটিয়েছি এবং একসঙ্গে খেলেছি। আমি ইমরানকে খুব ভালোভাবে চিনি। সে একজন সৎ মানুষ।’
ইমরানের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মিয়াঁদাদ। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বলেন, ‘আমার প্রার্থনা হলো, যা সঠিক, তা যেন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর বেশি আর কী বলতে পারি? আপনারা আমার চোখে পানি এনে দিয়েছেন। আমি যা বলছি, হৃদয় থেকেই বলছি।’
ইমরানের জন্য নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি। মিয়াঁদাদের ভাষায়, ‘আমি যদি কিছু করতে পারি, অবশ্যই করব। আমরা সবাই পাকিস্তানি। আমরা সবাই পাকিস্তানের পতাকা বহন করেছি। অন্য সব মতপার্থক্যের অবসান হওয়া উচিত। দেশপ্রেমের দিক থেকে সে কারও চেয়ে কম নয়। আমরা ক্রিকেট মাঠে লড়েছি। কার জন্য লড়েছি? পাকিস্তানের জন্য। যা হওয়ার হয়েছে। মানুষ মাত্রই ভুল করে। এখন এটাকে শেষ করুন।’
ইমরান প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দেশের জন্য কাজ করেছেন বলে মনে করেন মিয়াঁদাদ। তিনি বলেন, ‘সে প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দেশের সেবা করেছে। তার বিরুদ্ধে চুরির কোনো অভিযোগ নেই, কিংবা সে ধরনের কোনো অভিযোগও নেই।’
ইমরানের শারীরিক অবস্থা এবং তাঁকে ঘিরে তৈরি পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মিয়াঁদাদ। সাবেক সতীর্থের কিছু হলে পাকিস্তানে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা তাঁর। মিয়াঁদাদ বলেন, ‘আল্লাহ না করুন, তার কিছু হলে কী ঘটবে দেশে, তা কি কল্পনা করতে পারেন? পুরো পাকিস্তান কাঁদবে।’
ইমরান ও মিয়াঁদাদের ক্রিকেটীয় সম্পর্কের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি ১৯৯২ বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে তৃতীয় উইকেটে দুজন মিলে গড়েছিলেন ১৩৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। সেই জুটি পাকিস্তানকে ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের পথে বড় ভূমিকা রাখে।
বিশ্বকাপ জয়ের পর ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ইমরান। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ক্ষমতা থেকে অপসারিত হওয়ার পর দুর্নীতিসহ বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও মামলায় অন্যায় করার কথা বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন ইমরান। এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করে আসছেন তিনি।
ইমরানের চিকিৎসা ও কারাগারে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে সম্প্রতি পাকিস্তান সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছেন ২১ জন সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়ক। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইমরানের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এর মধ্যেই মিয়াঁদাদের আবেগঘন এই বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এনেছে পাকিস্তানের সাবেক বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের মুক্তির বিষয়টি।
সময়ের আলো/টিকে