বিদুর পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের দাবিলে গ্রামের পাহাড়ের ঢালে টিনের চালের একটি ছোট্ট বাড়ি। আশপাশে আর কোনো বাড়িঘর নেই। বাড়িটি থেকে নিচে তাকালেই চোখে পড়ে বুধবারের ভয়াবহ ভোটেকোশী নদীর বন্যায় বিধ্বস্ত জনপদ। কোথাও পাকা বাড়ি ডুবে আছে পানিতে, কোথাও নদীর ওপারের অক্ষত বাড়িগুলোও পড়ে আছে জনশূন্য, ভুতুড়ে নীরবতায়।
কিন্তু এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও পাহাড়ের ঢালের সেই ছোট্ট বাড়িটিতে মানুষের আনাগোনা থামেনি। বরং বন্যার পর থেকে সেটিই হয়ে উঠেছে বিপন্ন মানুষের আশ্রয়স্থল।
বন্যার দিন, ১৬ আগস্ট, দুর্যোগ থেকে বেঁচে যাওয়া ৩১ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক রাত কাটিয়েছিলেন ওই বাড়িতে। কাছের উত্তরগয়া পাবলিক মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের জন্য রাতারাতি নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয় বাড়িটি।
এরপর থেকে ভটেকোশীর বন্যায় নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে আসা মানুষদেরও আশ্রয় দিচ্ছেন বাড়ির মালিক প্রেম বাহাদুর তামাং ও তার স্ত্রী মাইয়া তামাং। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন মানুষ সেখানে আসছেন। বন্যার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২০০ জনের বেশি মানুষ এই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
জঙ্গলের ধারে অবস্থিত বাড়িটি দীর্ঘ পথ হেঁটে ক্লান্ত মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে পানীয় জল, খাবার ও ঘুমানোর জায়গা। আশপাশে আর কোনো বাড়িঘর না থাকায় জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা মানুষ এবং বন্যা ও ভূমিধসে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে আসা পরিবারগুলোর জন্য এটি এখন নিরাপদ আশ্রয়।
প্রেম বাহাদুর ও মাইয়া— দুজনেই প্রতিবন্ধী। প্রেম বাহাদুরের মেরুদণ্ডে আঘাত রয়েছে। লাঠির সাহায্যে তিনি চলাফেরা করেন। মাইয়ার বাম পা নড়াচড়াতেও সমস্যা রয়েছে। নিজেদের শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দরজায় আসা কাউকেই ফিরিয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা। অতিথিদের যাতে খালি পেটে থাকতে না হয়, সে চেষ্টাও করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
এদিকে খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য সরকারি সহায়তা এখনো পর্যাপ্তভাবে ওই এলাকায় পৌঁছায়নি। ফলে নিজেদের সামান্য সম্বল দিয়েই দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এই দম্পতি।
সংসার কীভাবে চলে জানতে চাইলে মাইয়া জানান, তার স্বামী মাসে ৩ হাজার টাকা বার্ধক্য ভাতা পান। তিনি নিজে পান ২ হাজার টাকা। তাদের সন্তানরাও মাঝে মাঝে টাকা পাঠান। ‘এভাবেই আমরা টিকে থাকি,’ বলেন মাইয়া।
পাহাড়ি জমিতে উৎপাদিত ফসলও সারা বছর চলে না তাদের। তার ওপর বানরের উপদ্রবে ফসল রক্ষা করাও কঠিন বলে জানান তারা। বন্যার দিন বাড়ির বাইরে বসেছিলেন প্রেম বাহাদুর। হঠাৎ ভটেকোশী নদীর গর্জন শুনে লাঠিতে ভর করে নদীর দিকে এগিয়ে যান তিনি। দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে স্ত্রী মাইয়াকে ডাকেন।
‘দেখো, বন্যা সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে,’ সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে বলেন তিনি।
তার ভাষায়, চোখের সামনেই মানুষ ভেসে যাচ্ছিল, তলিয়ে যাচ্ছিল ঘরবাড়ি। কিন্তু কাউকে উদ্ধার করতে যাওয়ার মতো শারীরিক অবস্থায় ছিলেন না তাঁরা। প্রথমে তাঁরা ভেবেছিলেন, বন্যার পানি হয়তো এতটা বাড়বে না। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বেত্রাবতী বাজার নদীর খাতে পরিণত হয়। যানবাহন চলাচলের রাস্তা ভেসে যায়। পানিতে ডুবে যায় স্কুল, তলিয়ে যায় স্কুলবাসও।
চার প্রজন্ম ধরে ওই এলাকায় বসবাস করা প্রেম বাহাদুর বলেন, জীবনে এমন বিপর্যয় আগে কখনো দেখেননি তিনি। ‘এটাকে বন্যা বলেও মনে হচ্ছিল না। দেখে মনে হচ্ছিল যেন আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরিত হয়েছে,’ বলেন তিনি।
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সবকিছু করার চেষ্টা করছেন বলে জানান দম্পতি।
মাইয়া বলেন, তাদের চাল ও ডালের মজুতও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। শারীরিক অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও আশ্রয় নেওয়া মানুষের জন্য রান্না করছেন তিনি। কেউ কেউ আবার নিজেরাই রান্না করে নিচ্ছেন।
‘আমরা আর কী-ই বা করতে পারি? পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে সবাই নিজেরা রান্না করে খেতে পারে। আমাদের বাড়ি খুঁজতে কে আসবে? এমন সময়েই তো আমাদের সাহায্য করতে হয়। আমরা আমাদের সাধ্যমতো সবকিছুই করি,’ বলেন মাইয়া।
তিনি জানান, তাদের কাছে আর মাত্র কয়েক দিনের মতো চাল ও ডাল রয়েছে।
এই বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের একজন মাইয়ার দেবর জুহানলাল তামাং। বাড়ি হারিয়ে তিনি পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। তার নাতি ভটেকোশীর স্রোতে ভেসে গিয়ে এখনো নিখোঁজ।
একইভাবে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন হরিবাহাদুর রায়। তার অঙ্গিতরে এলাকার বাড়ি ভেসে গেছে। নিখোঁজ স্বজনদের মধ্যে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী, নাতনি, শাশুড়ি ও শ্বশুর।
এভাবে একই পরিস্থিতিতে থাকা আরও কয়েকটি পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছেন প্রেম বাহাদুর ও মাইয়া।
মাইয়া বলেন, ‘বাড়িটা ছোট হলেও আমরা সবাই ভেতরে-বাইরে থাকি, ঘুমাই এবং নিজেদের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিই । আমাদের বাইরে গিয়ে খাবার ও পানি আনার মতো অবস্থাও নেই। কোথাও থেকে যদি কিছু জোগাড় করা যেত, তাহলে অন্তত যারা খালি পেটে আশ্রয় নিতে আসে, তাদের ফিরিয়ে দিতে হতো না।’
এই দম্পতির দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। কেউ তাদের সঙ্গে থাকেন না। বড় ছেলে বিশাল কাজের জন্য ভারতে রয়েছেন। ছোট ছেলে বুদ্ধ ত্রিশূলী-বেত্রাবতী সড়কে অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং বাবা-মাকেও সহযোগিতা করতেন।
ভোটেকোশীর বন্যায় শুধু বুদ্ধের অটোরিকশাই ভেসে যায়নি, ধ্বংস হয়ে গেছে তার কাজের পথও।
‘এখন আমরা কী করব?’ মাথা নিচু করে প্রশ্ন করেন বুদ্ধ। তিনি আরও বলেন, ‘আমার বাবা-মা প্রতিবন্ধী এবং আমাদের পরিবার খুব কষ্টে আছে। কোনো কাজ পেলে আমি যেকোনো কায়িক শ্রমের কাজই করতাম।’
এখনো কোনো সরকারি সংস্থা ওই এলাকায় পৌঁছাতে পারেনি। নদীতে ভেসে থাকা মৃতদেহগুলো পচতে শুরু করেছে। অন্যদিকে বাড়ির ভেতরে আটকা পড়ে থাকা অনেকের মরদেহও এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
চারদিকে ধ্বংসস্তূপ আর শোকের এই আবহের মধ্যেও পাহাড়ের ঢালে তামাং দম্পতির ছোট্ট বাড়িটি অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে— নিজেদের সামান্য সম্বল দিয়ে যেখানে প্রতিদিন আশ্রয় পাচ্ছেন বিপর্যস্ত মানুষ।
সময়ের আলো/জেডি