এবার ওষুধ-পানির সংকটে নেপালের দুর্গতরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

নেপালের ভোটেকোশী নদীর ভয়াবহ বন্যার পর এবার নতুন সংকটের মুখে পড়েছেন বাস্তুচ্যুত মানুষজন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে ওষুধ

2026-08-29T19:16:49+00:00
2026-08-29T19:16:49+00:00
 
  শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬,
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
এবার ওষুধ-পানির সংকটে নেপালের দুর্গতরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:১৬ পিএম 
রাসুয়া জেলার বন্যা-বিধ্বস্ত বেত্রাবতী থেকে উদ্ধার করে নুয়াকোটের বিদুরে নেপালি সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে আনা হয়েছে এক নতুন মা ও তার নবজাতক শিশুকে। সংগৃহীত ছবি
নেপালের ভোটেকোশী নদীর ভয়াবহ বন্যার পর এবার নতুন সংকটের মুখে পড়েছেন বাস্তুচ্যুত মানুষজন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীরা। 

অন্যদিকে হাসপাতালগুলোও কমতে থাকা ওষুধের মজুত, জ্বালানি সংকট ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

ত্রিশুলি বাজারের বাসিন্দা রেখা দেবী গোসাইনের জন্য বন্যা থেকে বেঁচে ফেরাটাই ছিল কেবল প্রথম পরীক্ষা। তিনি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত। নিয়মিত তাকে ওষুধ খেতে হয়। কিন্তু বন্যায় তার বাড়ি ও চারটি দোকান ভেসে যাওয়ার সময় ওষুধপত্র সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ পাননি। হারিয়েছেন গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য জিনিসপত্রও।

এখন তিনি পরিবারের সঙ্গে ত্রিশুলি হাসপাতালের কাছে একটি বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে থাকছেন। কিন্তু যে হাসপাতালে আশ্রয় নিয়েছেন, সেখানেও তার প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই।

রেখার ছেলে রঘুবীর বলেন, ‘আমার মাকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, কিন্তু হাসপাতালে সেগুলো নেই। তিন দিন হলো তিনি ওষুধগুলো খেতে পারছেন না।’ 

এই পরিবারের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায় যখন শিবিরে আশ্রয় নেওয়ার সময় রঘুবীরের ভাবির প্রসববেদনা ওঠে। ত্রিশুলি হাসপাতালে তার প্রসব করানোর ব্যবস্থা ছিল না। অন্যদিকে কাঠমান্ডু যাওয়ার সড়ক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন ছিল।

রঘুবীর জানান, বারবার অনুরোধের পর শনিবার সকালে তার ভাবিকে আকাশপথে কাঠমান্ডুর থাপাথালিতে অবস্থিত পরোপকার প্রসূতি ও মহিলা হাসপাতালে নেওয়া হয়।

একই সংকটে রয়েছেন আরও বহু বাস্তুচ্যুত মানুষ। ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হারিয়ে দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত অনেকেই দিনের পর দিন নিয়মিত ওষুধ ছাড়া থাকছেন।

কোলানি এলাকার একটি বাস্তুচ্যুত শিবিরে ৬২ বছর বয়সী মায়ের দেখাশোনা করছেন কপিলা পারিয়ার। তার মা হাঁপানিতে আক্রান্ত এবং নিয়মিত ওষুধের ওপর নির্ভরশীল।

কপিলা বলেন, ‘আমার মায়ের হাঁপানি আছে এবং তার দুই-তিনটি ওষুধের প্রয়োজন হয়, কিন্তু আমরা সবগুলো জোগাড় করতে পারিনি।’ 

শুধু ওষুধ নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতেও হিমশিম খাচ্ছে পরিবারটি।

কপিলা বলেন, ‘ক্যাম্পে কোনো পানীয় জল নেই এবং আমরা বোতলজাত জলও কিনতে পারছি না। আমাদের কাছে টাকা নেই, জামাকাপড় নেই এবং কোলানি বাজারে কেনার মতো প্রায় কিছুই নেই।’

বন্যার পর থেকে কপিলার ১৬ বছর বয়সী ভাই অবিনাশ এবং ৪৩ বছর বয়সী ভাবি শান্তিও নিখোঁজ রয়েছেন।

চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ খাওয়া বন্ধ করতে বাধ্য করা হলে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অথচ ত্রিশুলি হাসপাতাল নিজেই এখন ওষুধ সংকটে পড়েছে।

হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মহেশ্বর যাদব জানান, উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যাটেনোলল ও লোসারটানের মতো ওষুধও পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেট না থাকায় আমাদের হাসপাতালের বীমা কার্যক্রমও চালু নেই এবং ওষুধও ফুরিয়ে আসছে।’

ত্রিশুলি হাসপাতালের তথ্য কর্মকর্তা রিকেশ রানা জানান, হাসপাতালের আশপাশে আশ্রয় নেওয়া অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানির মতো রোগ রয়েছে। কিন্তু তাঁরা নিয়মিত প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না।

পানির সংকটেও বাড়ছে উদ্বেগ

সংকট শুধু ওষুধে সীমাবদ্ধ নেই। বন্যায় হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকার পানীয় জলের প্রধান উৎসগুলোও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

বাসিন্দা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগে ত্রিশুলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি খাল থেকে পানি সংগ্রহ করতেন। বন্যায় সেই খালটি ধ্বংস হয়ে গেছে। টুপচের মধ্য দিয়ে পানি সরবরাহকারী একটি পৃথক পাইপলাইনও ভেসে গেছে।

দুটি ব্যবস্থাই অচল হয়ে যাওয়ায় বাস্তুচ্যুত ও স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতের কাছে যে পানি পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়েই প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে।

চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করছেন, পানির সংকট ও দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থা নতুন আরেকটি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে জনাকীর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

ত্রিশুলি হাসপাতালের আশপাশের বাঘতার এলাকায় তিনটি বাস্তুচ্যুত শিবির স্থাপন করা হয়েছে। ভৈরুং মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আচ্ছাদিত হল ও বেথান একাডেমিতে প্রায় ১ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে গর্ভবতী নারী, সদ্য মা হওয়া নারী এবং চিকিৎসাসেবা প্রয়োজন এমন অনেক মানুষ রয়েছেন।


বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের তীব্র সংকটের পাশাপাশি শৌচাগারের দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

ত্রিশুলি হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট রাজেন্দ্র লামা বলেন, ‘এক জায়গায় এত মানুষ একসঙ্গে বসবাস করায় রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। নিরাপদ পানীয় জল ও উপযুক্ত শৌচাগারের অভাব মহামারির সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে।’

বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা আরও অভিযোগ করেছেন, শিবিরগুলোতে দেওয়া খাবারও অপর্যাপ্ত। এতে পর্যাপ্ত পুষ্টি নেই। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, সদ্য মা হওয়া নারী ও অসুস্থদের জন্য বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, বাড়ছে হাসপাতালের চাপ

বন্যায় এলাকার সব সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় জেলা সদর দপ্তরের সঙ্গে ত্রিশুলি হাসপাতালের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন। ফলে রোগী আনা-নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজেন্দ্র লামা বলেন, জরুরি রোগী অন্যত্র পাঠানোর প্রয়োজন হলেও সবসময় হেলিকপ্টার পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে আনা এবং বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। যদি আমাদের কোনো রোগীকে অন্যত্র পাঠাতে হয়, তবে হেলিকপ্টারে করে সরিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।’

এদিকে হাসপাতালটি নিজস্ব কার্যক্রম চালিয়ে যেতেও নানা সংকটে পড়েছে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মজুত কমে আসছে। রান্নার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অ্যাম্বুলেন্সেও ডিজেলের সংকট দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা।

লামা জানান, বর্তমানে হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় মাত্র সাত-আটজন পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। ফলে রোগী, স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসাকর্মীরা ক্রমশ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।

তিনি বলেন, ‘দিনের বেলাতেই লুটপাট শুরু হয়ে গেছে। আমাদের আরও পুলিশি টহল ও নিরাপত্তা প্রয়োজন।’

লামার দাবি, শুক্রবার চার-পাঁচজন মুখোশধারী ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে অস্ত্রোপচাররত চিকিৎসকদের তাড়িয়ে দেন। এরপর আশপাশের বাড়িঘরে লুটপাট শুরু হয়।

তিনি বলেন, ‘শুক্রবার দিনের আলোতেই লুটপাট হয়েছে।’

লামা আরও বলেন, নিরাপত্তাহীনতার সুযোগে কালোবাজারি কার্যক্রমও বেড়েছে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই ওষুধ, পানি, জ্বালানি, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তার এই বহুমুখী সংকট দুর্গত মানুষের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   ওষুধ  পানি  সংকট  নেপাল  দুর্গতরা 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: