নেপালের বন্যা : মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার গল্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

গত বুধবার সকালে নেপালের ভোটেকোশি নদী ভয়ংকর রূপ নেওয়ার পর কেউ ছুটেছেন উঁচু পাহাড়ের দিকে, কেউ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পালিয়েছেন,

2026-08-29T17:40:55+00:00
2026-08-29T17:40:55+00:00
 
  শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬,
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
নেপালের বন্যা : মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার গল্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৪০ পিএম 
ছবি : সংগৃহীত
গত বুধবার সকালে নেপালের ভোটেকোশি নদী ভয়ংকর রূপ নেওয়ার পর কেউ ছুটেছেন উঁচু পাহাড়ের দিকে, কেউ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পালিয়েছেন, আবার কেউ গাড়ি নিয়ে বন্যার স্রোতের আগে ছুটে জীবন বাঁচিয়েছেন। একজন বিদ্যুতের তার আঁকড়ে ধরে বেঁচেছেন। আরেকজন বন্যার কিছুক্ষণ আগে অন্যত্র চলে যাওয়ায় রক্ষা পেয়েছেন। তবে প্রাণে বেঁচে গেলেও ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতা তাদের পিছু ছাড়ছে না। চোখের সামনে বসতি বিলীন হতে দেখা, বন্ধু-স্বজনকে স্রোতে ভেসে যেতে দেখা কিংবা প্রিয়জনের কোনো সন্ধান না পাওয়া— এসব স্মৃতি এখনো তাড়া করছে তাদের।

নেপালের সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে সাতজন বেঁচে ফেরা মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।

বিদ্যুতের তার আঁকড়ে বেঁচে গেলেন রামবচন
দেশটির রাউতাহাটের রাজদেবী পৌরসভার বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সী রামবচন সাহ বুধবার ত্রিশূলী বাজারে একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করছিলেন। ১৫ বছর ধরে ওই দোকানে কাজ করা রামবচন সেদিন সকালে মিষ্টি তৈরি করছিলেন। হঠাৎ বন্যার পানি দোকানে ঢুকে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। স্রোতের মধ্যে তার হাত একটি বিদ্যুতের তারে আটকে যায়। প্রায় আধা ঘণ্টা সেই তার আঁকড়ে ঝুলে থেকে প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

রামবচন বলেন, নিজেকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় না দেখে কাছের একটি বিদ্যুতের তার ধরে ফেলেছিলেন। হাত ফসকে গেলে তার বেঁচে থাকার কোনো সুযোগ ছিল না।

তবে তিনি বেঁচে ফিরলেও ওই দোকানের তিনজন— সংগীতা, তার ছেলে রাহুল ও আরেক কর্মী বিনোদ ভগত— এখনো নিখোঁজ।

বন্যার আতঙ্ক এখনো তার মনে তাজা। তার বড় ভাই রবীন্দ্র জানান, পুরো দিন পরিবারের সঙ্গে রামবচনের যোগাযোগ ছিল না। সন্ধ্যার দিকে তার খোঁজ পাওয়ার পর পরিবার জানতে পারে তিনি বেঁচে আছেন।

বেঁচে গেলেন শচীন, হারিয়ে গেল মামার পুরো পরিবার
ঝাপা জেলার শচীন খাটি বন্যার সময় ঘটনাস্থলে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। তবে হারিয়েছেন মামা রাজ কুমার দিয়ালি, মামি শ্রিতি ও তাদের চার বছরের ছেলে শ্রীরাজকে। ৩৩ বছর বয়সী রাজ কুমার রাসুয়ার স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ১৫ বছর ধরে গয়নার ব্যবসা করতেন। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সেখানেই থাকতেন। শচীনও তাদের সঙ্গে থেকে ব্যবসায় সহযোগিতা করছিলেন।

গত বুধবার সকালে রাজ কুমার কাজের জন্য শচীনকে চিলিমেতে পাঠান। বন্যার খবর পেয়ে শচীন দ্রুত ফিরে এলেও ততক্ষণে তাদের বসতিটি স্রোতে ভেসে গেছে। এখন ধুনচেতে নেপালি সেনাবাহিনীর আশ্রয়ে রয়েছেন শচীন। তার মামার পরিবারের কোনো সন্ধান এখনো মেলেনি।

রাজ কুমারের ভাতিজি রাধা খাটি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, জীবিত অবস্থায় তাদের খুঁজে পাওয়া সম্ভব না হলেও অন্তত মরদেহগুলো যেন পাওয়া যায়—এটাই পরিবারের এখন একমাত্র আশা।

বন্যার আগে ছুটে গাড়ি চালিয়ে বাঁচলেন রাজ কুমার
মাকওয়ানপুরের রাজ কুমার কার্কি বন্যার স্রোতের সামনে পড়ে না গিয়ে উল্টো স্রোতের আগে গাড়ি চালিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। গত মঙ্গলবার নুওয়াকোটের বেত্রাবতিতে পৌঁছানোর পর বুধবার সকালে পণ্য বোঝাই করতে তিমুরের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। যাত্রার প্রস্তুতির সময় মাইকে সতর্কবার্তা শুনতে পান—‘বন্যা আসছে’। সঙ্গে সঙ্গে কনটেইনার ট্রাক ঘুরিয়ে গালছির দিকে রওনা হন রাজ কুমার। কিছুক্ষণ পরই দেখতে পান বিশাল পানির দেয়াল দ্রুত তার দিকে ধেয়ে আসছে। তিনি গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেন। তার সামনে থাকা গাড়ি ও চালকদের অনেকেই স্রোতে ভেসে যান। তাদের মধ্যে কিরণ ভুজেলের চালানো আরেকটি কনটেইনার ট্রাকও ছিল।

রাজ কুমার বলেন, তার ঠিক পেছনেই ছিল উত্তাল ভোটেকোশির স্রোত। প্রায় নয়টি কনটেইনার ট্রাক ও তাদের চালক তার পেছনে থেকে স্রোতে ভেসে যান। পরে ত্রিশূলীর ধুঙ্গে বাজারে পৌঁছানোর আগে তিনি ট্রাকটি পাহাড়ের দিকে তুলে দেন। এতে তার জীবন ও ট্রাক—দুটিই রক্ষা পায়। পাহাড়ে রাত কাটানোর সময় তিনি বেত্রাবতীসহ আশপাশের বসতিগুলো ধ্বংস হতে দেখেন। অনেক এলাকা নদীর তলদেশে পরিণত হয়। নিজের বন্ধুদেরও ত্রিশূলী নদীতে ভেসে যেতে দেখেছেন তিনি।

‘এখনো স্বপ্নের মতো মনে হয়’
রাসুয়া জেলার মেইলুং এলাকায় ২১৬ মেগাওয়াটের আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে কাজ করছিলেন সাল্যানের ৪০ বছর বয়সী গাথে কামি। বুধবার সকালে হঠাৎ পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার মতো শব্দ শুনতে পান তিনি। এরপর দেখেন ভোটেকোশি নদীর পানি ভয়ংকর গতিতে তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। সঙ্গে থাকা সবাইকে দৌড়াতে বলেন কামি। এরপর প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু পাহাড়ি জঙ্গলের দিকে দৌড়ে ওঠেন। আতঙ্কে তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারান। জ্ঞান ফেরার পর নিচের বসতি পুরোপুরি চাপা পড়ে থাকতে দেখেন। চারদিকে মানুষের চিৎকার শুনতে পান।

কামি বলেন, ঘটনাটি এখনো তার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। চোখ বন্ধ করলেই সেই দৃশ্য সামনে ভেসে ওঠে। ছোটবেলায় গরু-ছাগল চরাতে গিয়ে খাড়া পাহাড়ে দৌড়ানোর অভিজ্ঞতা সেদিন তাকে পালাতে সাহায্য করেছে।

জঙ্গলে দৌড়েই বাঁচলেন রাজু
রামেছাপের মানথালি পৌরসভার বাসিন্দা কাস্টমস এজেন্ট রাজু বুধাথোকি তিমুরেতে নিজের কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হঠাৎ পুরো পাহাড় কাঁপতে শুরু করে।

রাজু বলেন, মনে হচ্ছিল ভূমিকম্প হয়েছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জীবন বাঁচাতে ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড় দেন।

তিনি একটি পুলিশ পোস্টের দিকে ছুটলেও দেখেন পুলিশ সদস্যরাও পালাচ্ছেন। পেছনে তাকিয়ে দেখেন, তিমুরের ঘরবাড়ি একের পর এক বন্যার স্রোতে ভেঙে পড়ছে। কিছু বাড়ি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ত্রিশূলী নদীতে হারিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বসতি থেকে প্রায় ৫০০ মিটার ওপরে একটি জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেন তিনি। সেখানেই প্রাণে বেঁচে যান।

ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নতুন জীবন পেলেন প্রকাশ
কাঠমান্ডুর গোকার্ণেশ্বরের বাসিন্দা প্রকাশ গৌতমও তিমুরেতে ছিলেন। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। প্রকাশ বলেন, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বসতি অন্ধকার হয়ে যায় এবং আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়। কোথায় যাবেন, কিছু না ভেবেই প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দেন তিনি।

পালানোর সময় বাঁ পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলে আঘাত পান। পরে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকে বন্যার পানিতে মরদেহ ভেসে যেতে দেখেন। তিমুরে তখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রকাশ ও অন্যরা বুধবার রাত জঙ্গলে কাটান। নেপালি সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে ফেলা ইনস্ট্যান্ট নুডলস খেয়ে তারা রাত পার করেন।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে তাদের বিদুরে নিয়ে যাওয়া হয়। হেলিকপ্টারে ওঠার পরই প্রথমবার তার মনে হয়, তিনি বেঁচে যাবেন।

ঢেউয়ের ধাক্কাতেই প্রাণ বাঁচল তুলসীর
দোলাখার বাসিন্দা তুলসী বাহাদুর ভান্ডারি রাসুয়ার একটি বসতিতে ছিলেন। হঠাৎ কালো কাদা ও পানির প্রবল স্রোত পুরো এলাকা ভাসিয়ে নিতে শুরু করে। ভান্ডারি বলেন, হঠাৎ ভবনগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করে। কালো কাদা ও পানির সেই ভয়ংকর স্রোত কোথা থেকে এলো, তারা বুঝতেই পারেননি।

তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও স্রোত তাকে ধরে ফেলে। প্রবল ঢেউয়ের ধাক্কায় তিনি ছিটকে একটি পাহাড়ের দিকে চলে যান। ভান্ডারির ভাষায়, সেই ঢেউ যদি তাকে পাহাড়ের দিকে ছুড়ে না ফেলত, তাহলে আজ তিনি বেঁচে থাকতেন না। স্রোতের ধাক্কায় পাশের দিকে ছিটকে পড়ার কারণেই অলৌকিকভাবে ভেসে যাওয়া থেকে রক্ষা পান তিনি।


সময়ের আলো/কেএইচ



  বিষয়:   সময়ের আলো  চীন  নেপাল  বন্যা 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: