নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে শত শত শ্রমিক আটকা পড়ার শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

নেপালের ত্রিশূলী করিডোরে ভয়াবহ বন্যার পর বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ ও ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে শত শত শ্রমিক আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা

2026-08-29T17:25:05+00:00
2026-08-29T17:25:05+00:00
 
  শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬,
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে শত শত শ্রমিক আটকা পড়ার শঙ্কা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৫:২৫ পিএম 
ছবি : সংগৃহীত
নেপালের ত্রিশূলী করিডোরে ভয়াবহ বন্যার পর বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ ও ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে শত শত শ্রমিক আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন্যার তিন দিন পরও দুর্গত এলাকাগুলোতে পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

বন্যার পানিতে সড়ক ও সেতু ভেসে গেছে। অনেক সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ কাদা ও ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়েছে। কোথাও কোথাও শ্রমিকেরা ঠিক কোন স্থানে আটকা পড়েছেন, সেটিও নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নেপালের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে একটি সুড়ঙ্গ থেকে শ্রমিক উদ্ধারের দৃশ্য দেখা গেছে। এতে নেপালি সেনাবাহিনীর সদস্যদের ঘন ও জমাট কাদার মধ্য দিয়ে কাজ করতে দেখা যায়। এক সেনাসদস্য আটকে থাকা এক শ্রমিককে টেনে বের করছেন, আরেকজন পেছন থেকে তাকে ধাক্কা দিয়ে সহায়তা করছেন।

২১৬ মেগাওয়াটের আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারের সময় ভিডিওটি ধারণ করা হয়। বন্যার পর বুধবার থেকেই ত্রিশূলী করিডোরের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও সুড়ঙ্গে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করছে নেপালি সেনাবাহিনী।

তবে এই উদ্ধার অভিযান বৃহত্তর সংকটের একটি অংশ মাত্র। স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠন ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন অব নেপাল (আইপিপিএএন) জানিয়েছে, নির্মাণাধীন প্রকল্পসহ ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৯৩৪ জনের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

ত্রিশূলী করিডোরের বিভিন্ন প্রকল্পে ঠিক কতজন আটকা পড়েছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বন্যার কারণে প্রকল্পগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার তৎপরতা জটিল হয়ে উঠেছে।

২২ দশমিক ১ মেগাওয়াটের চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মচারীসহ আটজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে ছয়জন সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চিলিমে জলবিদ্যুৎ কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক বাবুরাজ মহার্জন বলেন, সুড়ঙ্গটি কাদায় ভরে যাওয়ায় সেখানে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে না। উদ্ধারকাজে পাথর আরোহন বা পাহাড়ি উদ্ধারদল কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। বন্যায় প্রকল্পের সুড়ঙ্গ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাসুওয়াগাধি জলবিদ্যুৎ কোম্পানির তথ্য কর্মকর্তা নারায়ণ নাথ নেউপানে জানান, প্রকল্পটির ৪৯ কর্মীর সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। বাঁধ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৫৬ থেকে ৫৭ জন ছিলেন। তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ছয়-সাততলা ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে তিন থেকে ছয়জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন। অক্সিজেন সরবরাহের পাইপগুলো বন্ধ না হয়ে থাকলে তারা নিরাপদে আছেন বলে আশা করা হচ্ছে।

নেপালি সেনাবাহিনী আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্প থেকে এ পর্যন্ত ২৫৪ জন এবং ২০ মেগাওয়াটের লাংটাং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ১৮ জনকে উদ্ধার করেছে। তবে রাসুওয়াগাধি ও চিলিমেসহ কয়েকটি প্রকল্পের কর্মীরা এখনো উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। তাদের অভিযোগ, সরকার উদ্ধারকাজকে যথেষ্ট অগ্রাধিকার দিচ্ছে না।

লাংটাং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোক্তা বিজয় মোহন ভট্টরাই বলেন, প্রকল্পে যাওয়ার পথে কয়েকটি সেতু ভেসে যাওয়ায় এখন শুধু হেলিকপ্টারেই সেখানে পৌঁছানো সম্ভব। প্রকল্পটির ৪২ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে সরকারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

নেপালের জ্বালানি, পানি সম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাসহ ৩৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কাছে আরও তথ্য রয়েছে যে, ১০০ জনের বেশি মানুষ এখনো বিভিন্ন সুড়ঙ্গে আটকা রয়েছেন এবং নেপালি সেনাবাহিনীর দলগুলো উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, দুর্গত এলাকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে কর্মরত এক হাজারের বেশি কর্মীর সঙ্গে বর্তমানে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না—প্রাথমিকভাবে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপক, আইপিপিএএন ও নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে কর্মী ও শ্রমিকদের সর্বশেষ অবস্থার তথ্য হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে নিখোঁজদের স্বজন ও সহকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির কর্মী অভিষেক চৌহান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পে আটকে পড়াদের উদ্ধারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, তিন দিন পেরিয়ে গেলেও তারা নিখোঁজ রয়েছেন। সুড়ঙ্গের ভেতরে ও বাইরে ৩৫ জনের বেশি মানুষ উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন। পর্যাপ্ত জনবল ও বিশেষজ্ঞ নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্ধার অভিযান এখনো শুরু হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তবে জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আপার ত্রিশূলী-৩এ-এর ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্রে আটকে পড়া কর্মীদের উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চলছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে যাওয়ার তারের সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়েছে। সেনাবাহিনী ও কারিগরি দল খননযন্ত্র ব্যবহার করে সেটি পরিষ্কারের কাজ করছে।

নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীর্ঘায়ু কুমার শ্রেষ্ঠ জানান, কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ২০০ জনের বেশি মানুষের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, চিলিমেতে ১৫ থেকে ২০ জন, রাসুওয়াগাধিতে ১০০ জনের বেশি, আপার ত্রিশূলী-৩এ-এর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪০ থেকে ৪৫ জন এবং আপার ত্রিশূলী-৩বি-তে ২০ থেকে ২৫ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। বন্যার কারণে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সুড়ঙ্গের অবস্থানও নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।

নিখোঁজদের কয়েকজন ভূগর্ভে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুড়ঙ্গের ভেতরে অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব হলে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

বন্যায় ত্রিশূলী করিডোরের ১৪ থেকে ১৫টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মোট ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে এতে তাৎক্ষণিকভাবে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।

৩৭ মেগাওয়াটের আপার ত্রিশূলী-৩ প্রকল্পে শুরুতে ২১৩ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে বিমা কর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও ইন্টার্নশিপে থাকা শিক্ষার্থীরাও ছিলেন। পরে ৮৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রকল্পটির উন্নয়নকারী ত্রিশূলী হাইড্রোপাওয়ার কোম্পানি।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, প্রকল্প কার্যালয় ও নির্মাণস্থল পুরোপুরি বন্যার ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়ে কার্যত নদীর তলদেশে পরিণত হয়েছে। সেখানে নিখোঁজদের সন্ধানে ভারী খননযন্ত্র প্রয়োজন হলেও সড়ক যোগাযোগ না থাকায় তা পৌঁছানো যাচ্ছে না। সরকারি সংস্থার মাধ্যমে এলাকায় খননযন্ত্র নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

বন্যায় নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও সঞ্চালন অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন রুপি ছাড়িয়েছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো জীবিতদের খুঁজে বের করা, নিখোঁজদের উদ্ধার করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন পুনরায় চালু করা।

নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির মুখপাত্র রাজন ঢাকাল বলেন, প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অকল্পনীয়। রাসুওয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পুরোপুরি ভেসে গেছে এবং চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন রুপি বলে জানিয়েছেন তিনি।

নেপালি সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনোজ থাপা জানিয়েছেন, ১৯টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।


সময়ের আলো/কেএইচ


  বিষয়:   পাহাড়  বন্যা  ভূমিধস  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: