মস্তিষ্কের জীবন্ত নিউরন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মেলবন্ধনে বায়োলজিক্যাল কম্পিউটিংয়ের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। কম্পিউটারের মূল চালিকাশক্তি সিলিকন চিপ হলেও মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনের মতো পরিবেশ ও তথ্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা এর নেই। সিলিকন চিপ এবং মানব নিউরনের এই মৌলিক পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়ার এক দল গবেষক তৈরি করেছেন কৃত্রিম মানব নিউরননির্ভর এক ব্যতিক্রমী ‘বায়োলজিক্যাল ডেটা সেন্টার’।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইয়ং লু লিন স্কুল অব মেডিসিন (এনইউএস মেডিসিন), ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডেওয়ান’ এবং অস্ট্রেলিয়ার বায়োলজিক্যাল কম্পিউটিং প্রতিষ্ঠান ‘কর্টিক্যাল ল্যাবস’ যৌথভাবে যুগান্তকারী এই প্রোটোটাইপ বা আদি রূপটি উন্মোচন করেছে। বায়োলজিক্যাল ডেটা সেন্টারের মূল প্রযুক্তি-
বিশাল নিউরন নেটওয়ার্ক : এনইউএস মেডিসিনের তথ্য অনুযায়ী, সর্বমোট ২০টি ‘সিএল১’ ইউনিটের সমন্বয়ে একটি সার্ভার র্যাক তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি সিএল১ ইউনিটে রাখা হয়েছে পরীক্ষাগারে সংবর্ধিত প্রায় ৮ লাখ মানব নিউরন। ফলে পুরো সার্ভার র্যাকে থাকা নিউরনের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখে।
সংকেত আদান-প্রদান : এসব নিউরন সরাসরি বৈদ্যুতিক সংকেত গ্রহণ করতে এবং প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে সক্ষম। নিউরন থেকে আসা সেই প্রতিক্রিয়াগুলো কম্পিউটারে পাঠানোর মাধ্যমে কম্পিউটার ও জীবন্ত কোষের মধ্যে একটি নিরবচ্ছিন্ন সেতুবন্ধ তৈরি করা হয়েছে।
স্বভাবজাত শেখার ক্ষমতা : প্রচলিত কম্পিউটারে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাজের নির্দেশনা দেওয়া থাকে। অন্যদিকে এই বায়োলজিক্যাল ডেটা সেন্টার নিউরনের স্বাভাবিক শেখার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশ ও তথ্যের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত বদলে সক্ষম।
অস্ট্রেলিয়ার কর্টিক্যাল ল্যাবস মানব স্টেম সেল থেকে এই নিউরনগুলো তৈরি করেছে। পরে এগুলোকে ক্ষুদ্র ইলেকট্রোডযুক্ত বিশেষ সিলিকন প্ল্যাটফর্মে স্থাপন করা হয়। এসব ইলেকট্রোডের সাহায্যে নিউরনে সংকেত পাঠানো এবং ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। এই যোগাযোগ সুগম করতে কর্টিক্যাল ল্যাবস তৈরি করেছে ‘বায়োলজিক্যাল ইন্টেলিজেন্স অপারেটিং সিস্টেম’ বা ‘বায়োস’, যা হার্ডওয়্যার ও জীবন্ত কোষের সংযোগ স্থাপন করে।
জীবন্ত কোষকে ডেটা সেন্টারের অংশ হিসেবে সচল রাখা একটি বড় চ্যালঞ্জ। নিউরনগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে সিএল১ ইউনিটে বিশেষ পুষ্টি ও উপযুক্ত কৃত্রিম পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে কোষগুলো সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, সিলিকন চিপের চরম বিদ্যুৎ খরচের বিপরীতে এই ধরনের বায়োলজিক্যাল কম্পিউটিং সিস্টেম যেমন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী, তেমনি জটিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণায় নতুন ধারার উন্মোচন করবে।
সময়ের আলো/এসএকে