প্রধানমন্ত্রীর সফরসহ ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ এখনও ইতিবাচক। তবে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে যে জট তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে ঢাকা দিল্লিকে যে তিনটি শর্ত দিয়েছে, তার বাস্তব প্রতিফলন না ঘটলে সম্পর্ক কোনো দিকে যাবে, তা এখনও বলা মুশকিল।
তবে দিল্লি তার অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে। ইতিমধ্যে এমন একটি বার্তা পাওয়া গেছে। বার্তাটি হলো- গত শনিবার সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকদের সংগঠন এফসিসি সাউথ এশিয়ার একটি সেমিনার শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল।
কূটনীতিকরা আভাস দিচ্ছেন, বাংলাদেশ সরকারের চাওয়ার সঙ্গে ভারতের কার্যক্রমের সামঞ্জস্য ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে।
ভারত ইস্যুতে বাংলাদেশ এখনও ইতিবাচক। তবে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের জট সাফ করতে ঢাকা দিল্লিকে যে তিন শর্ত দিয়েছে তার বাস্তব প্রতিফলন না ঘটলে সম্পর্ক কোনদিকে যাবে তা বলা মুশকিল।
এরই মধ্যে বার্তা পাওয়া গেছে যে দিল্লি তার ভুল বুঝতে পেরেছে। যার বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে গত রোববার সন্ধ্যায় দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকদের প্রতিনিধিদের (এফসিসি সাউথ এশিয়া) একটি অনুষ্ঠান বাতিল করেছে ভারত। কূটনীতিকরা আভাস দিচ্ছেন যে বাংলাদেশ সরকারের চাওয়ার সঙ্গে ভারত সরকারের কার্যক্রম ক্রমশ দৃশ্যমান।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। এই ঘটনার দুই বছর পর গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে ভারত বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কথা বলার সুযোগ দিলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন সংকটের সৃষ্টি হয়।
সবশেষ ঘটনায় ঢাকা দিল্লিকে স্পষ্ট করে বলেছে যে বাংলাদেশে দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর অপরাধী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নেওয়া ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনাকে সেখানে রাজনৈতিক কিংবা মিডিয়াতে কথা বলার সুযোগ দেওয়া ভারতের গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার পরিপন্থী।
ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেকোনো অস্থিতিশীল তৎপরতা চালানো কিংবা দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি, সন্ত্রাসী বা খুনিকে স্পেস দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী দিল্লি কোনোভাবেই এর যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারে না।
ঢাকা আরও স্পষ্ট করে দিল্লিকে বলেছে, দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্ক সহজ করার ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দিতে হবে। দিল্লিতে বসে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকারীদের প্রত্যর্পণ করতে হবে।
দিল্লিতে শেখ হাসিনার কথা বলাকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের একাধিক উদ্যোগ পণ্ড হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশের প্রধাননমন্ত্রী এখনও ভারত ইস্যুতে ইতিবাচক। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী গত সপ্তাহে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। অন্যদিকে দিল্লির কর্মকাণ্ড যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছে তা ভারত সরকার দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছে।
দিল্লি যে তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে সে বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির গত ২২ আগস্ট সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হব। আমরা একটি ইতিবাচক সম্পর্ক চাই। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই তা করতে হবে। আমরা যদি আগামীকালও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারি, তা হলে আগামী সপ্তাহে যেতে পারি অথবা পরের সপ্তাহেও যেতে পারি। এখানে কোনো তাড়াহুড়া নেই। এখানে আলোচনা করার বিষয় আছে, প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয় আছে।
প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সফর তো এমন নয় যে, হুট করে গিয়ে হয়ে গেল। এটি কোনো খেলার বিষয় নয়। দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠকের আগে কিছু প্রস্তুতি ও ভিত্তি তৈরি করতে হবে। আমরা সেটিই করছি। সেখান (ভারত) থেকেও ইতিবাচক মনোভাব ও সদিচ্ছার ইঙ্গিত আসছে। তারা স্বীকার করেছে, বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর পলাতক শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছে। তারা বিষয়টি লক্ষ করেছে। এখন আমরা দেখি, বাকি আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয় কি না। আলোচনার ভিত্তিতে এবং আমাদের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সময় উপযুক্ত হলেই আমরা অবশ্যই ভারত সফরে যাব।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই বার্তার পর গতকাল রোববার দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকদের প্রতিনিধিদের (এফসিসি সাউথ এশিয়া) একটি অনুষ্ঠান বাতিল করেছে ভারত। এফসিসি সাউথ এশিয়া গত রোববার এক বার্তায় জানিয়েছে, ‘দিল্লি পুলিশ আজ (রোববার) সন্ধ্যায় নির্ধারিত ইউরোপ ও এশিয়াবিষয়ক অনুষ্ঠানটি আয়োজন করতে এফসিসিকে বাধা দিয়েছে। আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, এই আকস্মিক ঘটনাটি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এই অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত এবং আপনাদের সহানুভূতির প্রশংসা করছি।’
এফসিসি সাউথ এশিয়ার এই অনুষ্ঠানের নাম ছিল ‘ইউরোপ ও এশিয়া, সংলাপ থেকে অংশীদারত্বের দিকে’। এই অনুষ্ঠানের বিশেষত্ব হলো- এখানে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল।
দশ সদস্যের প্যানেলে আরও ছিলেন- চেক রাজনীতিবিদ ওন্দ্রেই দস্তাল, জার্মান কূটনীতিক পিটার ফারেনহোলৎস, বাংলাদেশি-মার্কিন বিজ্ঞানী নুরুন নবী, নেপালের শিশু অধিকারকর্মী সুন্দর ঘিমিরে, রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী রবি আলম, এফসিসি-আইএপিসির চেয়ারম্যান ভেঙ্কট নারায়ণ, সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি, ইউনাইটেড ডিপ্লোম্যাটিক কাউন্সিলের সভাপতি আসিফ ইকবাল এবং হ্যান্ড ইন হ্যান্ডের মহাসচিব গোলাম জিলানি। এফসিসির আমন্ত্রণপত্র অনুযায়ী, এই আয়োজনটি ছিল একটি সেমিনার এবং সংবাদ সম্মেলনের মিশ্র রূপ। বেলজিয়ামভিত্তিক সংগঠন হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে এটি আয়োজন করা হয়েছিল।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফায়েজ সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই সম্পর্কে বৈরিতা থাকলে দুই পক্ষেরই ক্ষতি। কিন্তু একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি ঢাকার ক্ষতির কথাই আগে বলব। কেননা, সম্পর্কে বৈরিতা জিইয়ে থাকলে ভারত সবসময়ই বাংলাদেশের পেছনে লেগে থাকবে এবং ক্ষতি করার চেষ্টা করবে।
তখন বাংলাদেশকে সেটি সামাল দেওয়ার জন্য বাড়তি এফোর্ট দিতে হবে; কিন্তু এতে কি সুস্থ পরিবেশ বিরাজ করবে? বাংলাদেশ ছোট দেশ এবং আমাদের সক্ষমতা কম। ভারতের মতো বড় দেশের সঙ্গে আমরা পায়ে পা ঠেকিয়ে ঝগড়া করতে পারব না। সম্পর্ক উন্নত করার জন্য এই সময়ে ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, যা আমাদের কাজে লাগানো প্রয়োজন।
প্রচুর লোক আছে, যারা চায় না যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সুসম্পর্ক বজায় রাখুক। যারা সুসম্পর্ক চায় না, তারা কেন চায় না এবং তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, সেগুলো আমাদের বুঝতে হবে। দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। এমন বৈঠক হলে সম্পর্কের টানাপোড়েন কমবে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ইস্যুতে আমি বলব যে, এমন সফরে আমাদের সব সমস্যা হয়তো সমাধান হবে না। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে যাওয়া উচিত।
আমাদের সম্পর্কে পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত ভাগাভাগিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আছে, যা দুই দেশের নাগরিকদের জীবনযাপনে প্রভাব ফেলে। দুই শীর্ষ নেতার দেখা হলে অনেক কঠিন সমস্যার সমাধান হবে, যা এখন আলোচনাই করা যাচ্ছে না।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক খারাপ থাকলে বাংলাদেশেরও ঝুঁকি আছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক ও গভীর। পারস্পরিক বৈরিতা বাংলাদেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ মুহূর্তে অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা বড় ইস্যু। এর বাইরে সীমান্ত উত্তেজনা, ইমিগ্রেশন ও ব্যবস্থাপনা; বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট; চিকিৎসা, শিক্ষা ও পর্যটন সম্পর্ক এবং চোরাচালান ও নিরাপত্তা ইস্যু রয়েছে।
সম্পর্ক বৈরী থাকা মানে এর সবকটি থমকে থাকবে, ক্রমান্বয়ে সম্পর্কের আরও অবনতি হবে এবং ফলে বাংলাদেশ প্রভূত প্রত্যক্ষ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। দুই দেশের জনসংখ্যা ১৭০ কোটি। পারস্পরিক বৈরিতা এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে জিম্মি করবে। আমি মনে করি, এ মুহূর্তে উভয় তরফে কূটনৈতিক পদ্ধতি শক্তিশালী করে বৈরিতা নিরসনের জন্য আশু উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। আর এই উদ্যোগের ভিত্তি হতে পারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং বাংলাদেশের উদ্বেগগুলো আমলে নেওয়া।
প্রাথমিক পর্যায়ে দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত হতে পারে, এমন বক্তব্য না দিতে দুই দেশ সম্মত হতে পারে। ভারত সীমান্ত হত্যা ও পুশইন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারে। একে অন্যের মাটি ব্যবহার করে একে অন্যের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী কোনো ধরনের প্রচার বা কর্মকাণ্ডের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
সময়ের আলো/এসএকে