চারিদিকে কালো মেঘ, মুষলধারে বৃষ্টি আর ঝোড়ো বাতাস। উত্তাল সাগরের বুক চিরে সজোরে আছড়ে পড়ছিল বড় বড় ঢেউ। সেই ঢেউয়ের ধাক্কায় বারবার ওপরে-নিচে দুলছিল একটি স্পিডবোট। তার ভেতরে অক্সিজেন সিলিন্ডার আর নাকে নল লাগানো অবস্থায় শুয়ে আছেন ৮০ বছরের বৃদ্ধা রওশন আরা। আর প্রতিটি ঝাঁকুনিতে নল খুলে যাওয়া কিংবা সিলিন্ডার উল্টে যাওয়া রোধ করতে আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন তার ছেলে জাহাঙ্গীর কবির। মাকে বুকে আগলে রাখা সেই কয়েক ঘণ্টার জলপথের যাত্রাটি তার কাছে মনে হয়েছিল এক অন্যরকম যুদ্ধ।
রোববার (৩০ আগস্ট) ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ধরা পড়ে সেই ভয়ংকর যাত্রার কিছু মুহূর্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। আর ভিডিওর কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্যের আড়ালে ছিল একটি পরিবারের দীর্ঘ আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা আর অসহায়ত্বের গল্প।
জাহাঙ্গীর কবিরের সাঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সন্দ্বীপ পৌরসভার তালতলি বাজারসংলগ্ন ছটাই বাড়ির বাসিন্দা রওশন আরা দীর্ঘ দিন ধরে শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল রোগে ভুগছেন। গত শনিবার রাতে হঠাৎ তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরদিন সকালে তাকে সন্দ্বীপ মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম শহরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন পরিবার।
সকাল ১০টার দিকে স্বজনদের নিয়ে সন্দ্বীপ ঘাটে পৌঁছান জাহাঙ্গীর। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই একটি স্পিডবোট জোগাড় করে শুরু হয় চট্টগ্রাম যাত্রা। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই আবহাওয়া আরও খারাপ রূপ নেয়। উত্তাল ঢেউ আর বৃষ্টির সঙ্গে চলতে থাকে জাহাঙ্গীরের অদৃশ্য লড়াই। এক হাতে মাকে ধরে রাখা, অন্য হাতে বারবার খুলে যাওয়া অক্সিজেনের নল ঠিক করা— সব মিলিয়ে এক দুঃসহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি। বিকেলের দিকে চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছাতে সক্ষম হলেও বিলম্বে পৌঁছানোর কারণে হাসপাতালে ভর্তির পর রওশন আরার শারীরিক জটিলতা আরও বেড়ে যায়, যাঁর অবস্থা এখনো আশঙ্কামুক্ত নয়।
জাহাঙ্গীরের এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি পরিবারের কষ্ট নয়, এটি সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের জরুরি চিকিৎসা ও রোগী পরিবহনের ভঙ্গুর ব্যবস্থার এক নির্মম চিত্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, মুমূর্ষু রোগীদের নিরাপদে পারাপারের জন্য দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও বাস্তবে কোনোটিরই সুফল মেলে না। এর মধ্যে একটি ২০০৮ সাল থেকে এবং অপরটি ২০১৫ সাল থেকে অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
এ বিষয়ে সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মানস বিশ্বাস জানান, দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্সই ব্যবহার অনুপযোগী এবং নতুন সি-অ্যাম্বুলেন্সের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি পাঠানো হলেও এখনো কোনো সাড়া মেলেনি।
মায়ের জীবন বাঁচাতে উত্তাল সাগরের সঙ্গে যুদ্ধ করা জাহাঙ্গীর কবিরের একটাই প্রশ্ন— জরুরি মুহূর্তে এই দ্বীপের মানুষের জীবন রক্ষায় প্রকৃত ভরসা তবে কোথায়? ভবিষ্যতে আর কোনো সন্তানকে যেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রিয়জনকে নিয়ে লড়াই করতে না হয়, এটাই এখন তার একমাত্র চাওয়া।
সময়ের আলো/জোই