আফগানিস্তান যুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই যুদ্ধ জেতার চেয়ে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসাই কঠিন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধটি ৫ বছর আগে, এক রোববার, বিশৃঙ্খলা ও পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
তালেবানদের হাত থেকে পালিয়ে যেতে মরিয়া লাখ লাখ আফগান সেদিন কাবুল বিমানবন্দরে ভিড় করেছিলেন। সেখানে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হন। কিন্তু এরপর থেকে যে আশঙ্কাগুলো ৩ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে বাধা দিয়েছিল, সেগুলো ভিত্তিহীন বলেই প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, আফগানিস্তান সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বা যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানোর ঘাঁটিতে পরিণত হয়নি।
এখন আবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানে নতুন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। সেখানেও সামরিক বিজয়ের সম্ভাবনা খুবই দুর্বল বলে মনে হচ্ছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চান। কিন্তু পরে আবার অবস্থান বদলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।
ওভাল অফিস থেকে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের সেখানে (ইরানে) থাকতে হবে না। তাদের তেলের আমাদের প্রয়োজন নেই। তাদের কাছ থেকে আমাদের কিছুই দরকার নেই। কিন্তু আমরা সেখানে আমাদের মিত্রদের সহায়তা করতে আছি।’
আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধ ইরানে সামনে এগোনোর পথ নিয়ে ভাবতে থাকা জেনারেল ও নীতিনির্ধারকদের সামনে কঠিন কিছু প্রশ্ন তুলে ধরছে- আফগানিস্তান থেকে বেরিয়ে আসা এত কঠিন কেন ছিল? আর সেখানে পরাজয় মেনে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের যে দীর্ঘ সংগ্রাম হয়েছিল, তা ইরানে ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান সংকট সম্পর্কে কী বলে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় প্রতিটি যুদ্ধেই কীভাবে বেরিয়ে আসবে, সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে।
নিরাপত্তা বিষয় নিয়ে গবেষণা করা থিংক ট্যাংক র্যান্ড করপোরেশনের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু আর হোয়েন বলেন, ‘গত কয়েক দশকে আমরা যেসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছি, তার অনেকটাই আসলে সাম্রাজ্য পরিচালনার কাজ।’
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা একটি অশান্ত বিশ্বে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে অথবা মার্কিন মূল্যবোধ রক্ষা করতে যুদ্ধে গেছে। হোয়েন বলেন, ‘আমরা অস্তিত্বের জন্য লড়াই করছি না।’
২০১১ সালের মে মাসে আল কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর আফগানিস্তান থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার মূল হোতা নিহত হয়েছিলেন এবং এক দশকের ড্রোন হামলায় তার সংগঠন ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে, মার্কিন হামলার আগে আফগানিস্তান শাসন করা এবং আল-কায়েদাকে আশ্রয় দেওয়া তালেবান বিদ্রোহীদের নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছিল।
আফগানিস্তানে মার্কিন কমান্ডারদের পরামর্শ দেওয়া কার্টার মালকাসিয়ান সম্প্রতি ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনে লিখেছেন, ‘তখন মার্কিন কর্মকর্তারা যদি আজ আমরা যা জানি, তা জানতেন, তাহলে তাদের অনেকেই, আমিও তাদের একজন, দ্রুত সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে আরও জোরালোভাবে অবস্থান নিতেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ, বিশ্বস্ত আফগান মিত্রদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং নিহত ও আহত সেনাদের আত্মত্যাগকে পরাজয়ের মাধ্যমে অসম্মান করা হবে, এমন ধারণা প্রেসিডেন্ট ও পেন্টাগনকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছিল। তালেবানের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের হারানো অনেক কর্মকর্তার কাছে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার ধারণাটি তাদের বহু বছরের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।
মালকাসিয়ান লিখেছেন, ‘সহজভাবে বললে, আমেরিকানরা কেন আফগানিস্তান থেকে আরও আগে চলে যায়নি, তার একটি কারণ হলো, মার্কিন সামরিক বাহিনী জেতার জন্যই লড়াই করে।’
রাজনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকেরাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। একই সঙ্গে একটি যুদ্ধ হেরে যাওয়ার রাজনৈতিক মূল্য নির্বাচনে দিতে হতে পারে, এমন আশঙ্কাও তাদের ছিল। ২০১১ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনার সংখ্যা কমতে শুরু করেছিল। আর তালেবান বুঝতে পেরেছিল, তাদের শুধু মার্কিন সেনাদের এবং যুদ্ধের জন্য অর্থ ও জনসমর্থন দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়া আমেরিকান জনগণের ধৈর্য শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
তালেবানকে পরাজিত করার সম্ভাবনা যত দূরে সরে যেতে থাকল, মার্কিন রাজনৈতিক নেতারাও তাদের লক্ষ্য পরিবর্তন করলেন। তারা হতাহতের সংখ্যা কমানো, যুদ্ধের ব্যয় কমানো এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ও অজনপ্রিয় আফগান সরকারকে টিকিয়ে রাখার দিকে মনোযোগ দিলেন।
আরও সংযত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া সংগঠন ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক রোজমেরি কেলানিক বলেন, ‘তারা এমন একজন চিকিৎসকের মতো, যিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা একজন রোগীকে দেখে জানেন যে রোগী মারা যাবে। তারা শুধু আশা করছেন, তাদের দায়িত্বের সময় শেষ হওয়ার পর রোগী মারা যাবে। তারা চান না, তাদের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সেটি ঘটুক।’
বিন লাদেন নিহত হওয়ার পরও যুদ্ধ আরও এক দশক চলেছে। এই সময়ে আরও ৮৬৮ জন মার্কিন সেনা সদস্য প্রাণ হারান। যুদ্ধের শেষ বছরগুলোতে আফগানিস্তানে সেনাদের নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন কমান্ডারদের মনে হয়েছিল, তাদের ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ২০১৮ সালে আফগানিস্তানে কমান্ডারের দায়িত্ব পাওয়ার সময় নিজের মানসিক অবস্থার কথা সম্প্রতি একটি পডকাস্টে স্মরণ করেন জেনারেল অস্টিন এস. মিলার, যিনি ছিলেন আফগানিস্তানে শেষ মার্কিন কমান্ডার। তিনি জানিয়েছিলেন, দায়িত্ব শেষ করে তার খুব ক্লান্ত এবং ‘ক্ষয়ে যাওয়া সুনাম’ নিয়ে ফিরে আসার আশঙ্কা ছিল।
নিজের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে তিনি রক ব্যান্ড স্টিলি ড্যানের একটি গানের কথাও রসিকতার সঙ্গে উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমি তোমার নোংরা কাজ করতে গিয়ে বোকা হচ্ছি।’
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ চলতি বছরের শুরুতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ইরানের যুদ্ধ আফগানিস্তান ও ইরাকের দীর্ঘ যুদ্ধের মতো কিছুই হবে না। তরুণ বয়সে আর্মি ন্যাশনাল গার্ডের কর্মকর্তা হিসেবে তিনি দুই সংঘাতেই মোতায়েন ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা তাকে ক্ষুব্ধ ও হতাশ করে তুলেছিল।
মার্চে সাংবাদিকদের হেগসেথ বলেছিলেন, ‘আমার কথা শুনুন। ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধ করা সেই লাখ লাখ মানুষের একজন আমি। আমি দেখেছি, বুশ, ওবামা ও বাইডেনের মতো আগের বোকা রাজনীতিকরা কীভাবে আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছেন।’
তিনি বলেছিলেন, “ওই যুদ্ধগুলো ছিল গভীর সংকট বা কাদায় আটকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি। কিন্তু ইরানের যুদ্ধ আলাদা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এটি হবে ‘লেজার-ফোকাসড’, প্রাণঘাতী, দ্রুত এবং ‘চূড়ান্ত।’”
হেগসেথ জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘এটি ইরাক নয়। এটি অন্তহীন যুদ্ধ নয়।’
এর জবাবে ইরান ব্যাপক হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। চলতি গ্রীষ্মের শুরুতে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সম্ভবত ইরানকে পরাজিত করা যাবে না, এমনকি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথও পুরোপুরি খুলে দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
সিনেটে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ‘আকাশশক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমাদের সবসময় সেই সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রাখতে হবে।’
এখন প্রশাসন আশা করছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের রফতানি বন্ধ করতে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সেই লক্ষ্য অর্জন করবে, যা আগের বিমান হামলাগুলো করতে পারেনি। প্রাথমিক কিছু লক্ষণে দেখা যাচ্ছে, প্রণালিটি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ এবং তেল রফতানির পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে।
এই সীমিত অগ্রগতি সত্ত্বেও মার্কিন সামরিক নেতারা আর দ্রুত বিজয়ের কথা বলছেন না, বরং তারা এমন একটি অভিযান নিয়ে কথা বলছেন, যার মাধ্যমে কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় ধরে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে। দীর্ঘদিনের মোতায়েনের কারণে আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা মার্কিন নৌবাহিনী কতদিন এই অবরোধ চালিয়ে যেতে পারবে, জানতে চাইলে হেগসেথ বলেন, ‘যতদিন প্রয়োজন, আমরা এটি ধরে রাখতে পারব, অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত।’
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সামনে এখন যে চ্যালেঞ্জ, তা আফগানিস্তানের পরিস্থিতির সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়। তালেবান বিদ্রোহীরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য লড়ছিল। ইরানের নেতারাও একইভাবে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য লড়ছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধে ঝুঁকি অনেক কম। ফলে, যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার খরচও তুলনামূলকভাবে কম।
মার্কিন সামরিক বাহিনী সম্ভবত হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারবে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রণালিটি খোলাই ছিল।
প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ. বুশের আমলে পেন্টাগনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা থমাস জি. মাহনকেন বলেন, ‘এটি করা সম্ভব। তবে, স্থলভাগে কিছুটা চেষ্টা করতে হবে। কারণ ইরানিরা কয়েক দশক ধরে অবস্থানগুলো নির্মাণ ও শক্তিশালী করেছে।’
এই মুহূর্তে এমন একটি অভিযানে প্রাণ ও অর্থের যে মূল্য দিতে হবে, তা ট্রাম্প বা আমেরিকান জনগণ বহন করতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে না। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকান জনগণ এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। বুধবার হেগসেথ আফগানিস্তান যুদ্ধ শেষ হওয়ার ৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে অবসরপ্রাপ্ত তিন মেরিন সেনাকে বীরত্বের জন্য উন্নত পদক প্রদান করেন। এই ৩ জনের মধ্যে দুজন কাবুল বিমানবন্দরের আত্মঘাতী বোমা হামলায় গুরুতরভাবে ছররা বা ধাতব টুকরোর আঘাতে আহত হয়েছিলেন। আহত হওয়ার পরও তারা আহত অন্যদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে সহায়তা করে গিয়েছিলেন।
অনুষ্ঠানে হেগসেথ তাদের বীরত্বের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘যখন দুষ্টরা সন্ত্রাস ছড়াতে চেয়েছিল, তখন এই মানুষগুলো ফটকের সামনে সিংহের মতো দাঁড়িয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল দৃঢ়, সংকল্প ছিল তীব্র এবং সাহস ছিল অটুট।’
এই অনুষ্ঠানটির আরেকটি উদ্দেশ্যও ছিল। দীর্ঘ ও অসন্তোষজনক আফগানিস্তান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পরাজয়কে সেখানে মোতায়েন ও যুদ্ধ করা সেনাদের জন্য একটি বিজয় হিসেবে নতুনভাবে তুলে ধরা।
মেরিন সেনাদের উদ্দেশে হেগসেথ বলেন, ‘আপনারা একটি প্রাণঘাতী, গর্বিত এবং অপরাজিত বাহিনীর অগ্রভাগ।’ এরপর তিনি তাদের দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা পদকগুলো প্রদান করেন। কিন্তু অনুষ্ঠানে কেউই দেশের পরাজয়ের কথা উল্লেখ করেননি।
সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধ
সময়ের আলো/মহু