ছোট্ট একটি কক্ষ, তিনজন ব্যবসায়ী, তিন ধরনের ব্যবসা। একজন ক্রেস্ট তৈরি করে বিক্রি করেন, আরেকজন পল্লী চিকিৎসক হিসেবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ বিক্রি করেন। অন্যজন নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পোশাক বিক্রি করেন। দোকান খোলা, বন্ধ করা থেকে শুরু করে মালামাল নিরাপদে রাখার দায়িত্বও তারা ভাগাভাগি করে নেন। পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও সহাবস্থানের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ময়মনসিংহের ত্রিশালের এই তিন ব্যবসায়ী।
ত্রিশাল পৌরসভার জামে মসজিদ রোড এলাকার একটি ছোট দোকানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন জিম্মানুল আনোয়ার। একসময় তিনি একাই কম্পিউটারের বিভিন্ন কাজ, ক্রেস্ট বিক্রি, মগ প্রিন্ট ও গেঞ্জিতে নাম প্রিন্টের কাজ করতেন। বর্তমানে তার নিজস্ব ক্রেস্ট তৈরির কারখানা রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন শত শত ক্রেস্ট তৈরি হয় এবং তার অধীনে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক কাজ করেন।
জিম্মানুলের তৈরি ক্রেস্ট দেশের বিভিন্ন এলাকার উদ্যোক্তাদের কাছে পাইকারি দামে বিক্রি হয়। অনলাইনের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, দরদাম ও অর্ডার নিশ্চিতের কাজও করেন তিনি। ব্যবসার পরিধি বড় হলেও ত্রিশালের এই ছোট দোকানটি এখনো ধরে রেখেছেন। এখান থেকেই ক্রেস্ট, মগ ও গেঞ্জি প্রিন্টের পাশাপাশি ফটোকপি ও কম্পিউটার কম্পোজের কাজ করা হয়।
দোকানের এক পাশে বসেন ৬৩ বছর বয়সি পল্লী চিকিৎসক ছফির উদ্দিন। তিনি রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ বিক্রি করেন। একই সঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিং ও ফ্লেক্সিলোডের কাজও করেন। অন্য পাশে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য পোশাক নিয়ে বসেন ৫৫ বছর বয়সি রেদুয়ান হোসেন। ফলে একই দোকানে পাশাপাশি চলছে তিন ধরনের ব্যবসা।
তিনজনের ব্যবসা আলাদা হলেও তাদের মধ্যে নেই কোনো বিরোধ বা প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব। বরং দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার ভিত্তিতে চলছে তাদের ব্যবসা।
দোকানের ভাড়া ও বিভিন্ন দায়িত্বও তারা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। মাসিক ভাড়া তিনজনে ভাগ করে পরিশোধ করেন। এতে প্রত্যেকের ওপর ভাড়ার চাপ কমে যায়। দোকান খোলা ও বন্ধ করার ক্ষেত্রেও রয়েছে পারস্পরিক সমন্বয়।
দোকানে তিনজনের আলাদা আলাদা মালামাল থাকলেও এ নিয়ে তাদের মধ্যে অবিশ্বাস নেই। একজন কোনো কাজে বাইরে গেলে অন্য দুজন তার মালামাল ও দোকানের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করেন। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে একই ছাদের নিচে ব্যবসা করে আসছেন তারা।
প্রিন্ট বাজারের স্বত্বাধিকারী জিম্মানুল আনোয়ার বলেন, আমাদের তিনজনের ব্যবসা আলাদা হলেও সম্পর্কটা খুব ভালো। দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে আছি। একজন কোনো কাজে বাইরে গেলে অন্যজন দোকানের দায়িত্ব দেখেন। এতে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস আরও বেড়েছে। একই জায়গায় থেকে ব্যবসা করলেও কারও কাজে কেউ বাধা দেই না; বরং প্রয়োজন হলে একে অপরকে সহযোগিতা করি।
পল্লী চিকিৎসক ছফির উদ্দিন বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আমরা একসঙ্গে ব্যবসা করছি। প্রত্যেকের নিজস্ব মালামাল ও হিসাব রয়েছে। তারপরও একজনের অনুপস্থিতিতে অন্যজন তার জিনিসপত্রের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখি। আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার কারণেই এতদিন সুন্দরভাবে একসঙ্গে থাকতে পারছি। যে দোকানে আগে আসি সে দোকান খুলে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করি। আবার যে সবার শেষে যায় সে সবকিছু গুছিয়ে দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরে।
পোশাক বিক্রেতা রেদুয়ান হোসেন বলেন, আমার কাপড়ের ব্যবসা, আর অন্য দুইজনের ব্যবসা আলাদা। তারপরও আমাদের মধ্যে কোনো ঝামেলা নাই। মাসের ভাড়া ভাগ করে দেই, তাই খরচও কম পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমদের একে অপরের উপর বিশ্বাস আছে। কেউ না থাকলে একজন আরেকজনের জিনিস দেখে রাখি। দাম জানা থাকলে বিক্রি করে পরে টাকা বুঝিয়ে দেই। এইভাবেই অনেক দিন ধরে মিলেমিশে ব্যবসা করে আসছি।
প্রেসক্লাব ত্রিশালের সভাপতি ইমরান হাসান বুলবুল বলেন, বর্তমানে যেখানে ভাইয়ে ভাইয়ে মিলেও সহজে একসঙ্গে কিছু করা কঠিন হয়ে পড়ে, সেখানে একটি ছোট দোকানে একসঙ্গে তিনজনের ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা করা সত্যিই বিরল। মিলেমিশে থাকলে মানুষের বিভিন্ন খরচ কমে আসে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়। এই তিন ব্যবসায়ী সমাজের জন্য একটি উদাহরণ হতে পারেন।
স্থানীয়রা বলছেন, বর্তমান সময়ে সামান্য স্বার্থের দ্বন্দ্বেও যেখানে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়, সেখানে একই দোকানে ভিন্ন ধরনের তিনটি ব্যবসা পরিচালনা করেও এই তিনজনের মধ্যে যে আস্থা ও সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তা প্রশংসনীয়। তাদের এই সহাবস্থান শুধু ব্যবসা পরিচালনার একটি কার্যকর ব্যবস্থা নয়; বরং পারস্পরিক বিশ্বাস, সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যেরও একটি দৃষ্টান্ত।
সময়ের আলো/আতা