পানি ঠান্ডা দামে গরম

নিজস্ব প্রতিবেদক

সারাদেশ

‘কচি ডাবের পানি, দু আনায় নাও খেয়ে যাও’— একসময় বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গানের কলি ছিল এটি। সেই গানের সঙ্গে জড়িয়ে

2026-09-01T04:44:44+00:00
2026-09-01T04:44:44+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
পানি ঠান্ডা দামে গরম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৪৪ এএম 
পানি ঠান্ডা দামে গরম । ছবি : সংগৃহীত
‘কচি ডাবের পানি, দু আনায় নাও খেয়ে যাও’— একসময় বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গানের কলি ছিল এটি। সেই গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একসময়ের স্মৃতি, যখন ডাব ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই। দু আনায় ডাবের পানি খাওয়ার সেই দিন এখন শুধুই স্মৃতি।

সময় বদলেছে, বদলেছে ডাবের দামও। এখন রাজধানীর কোনো কোনো এলাকায় একটি ডাব কিনতে গুনতে হচ্ছে ২০০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত। শরীরের উত্তাপ কমাতে ডাবের পানি পান করতে গিয়ে পকেটের উত্তাপ বাড়ছে নগরবাসীর।

মালিবাগের পদ্মা হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ডাব বিক্রেতা একটি বড় ডাবের দাম চাইছিলেন ২২০ টাকা। ছোট আকারের ডাবও মিলছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকার নিচে নয়। অবশ্য রাজধানীর সব এলাকায় একই দাম নয়। কোথাও কোথাও তুলনামূলক কম দামেও ডাব পাওয়া যাচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ডাবের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।

রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালের সামনে এখন ডাবের দোকানের ভিড়। এর অন্যতম কারণ ডেঙ্গু। চিকিৎসকের পরামর্শে অনেক রোগীকে ডাবের পানি পান করানো হচ্ছে। ফলে হাসপাতালকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে ডাবের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ।

তার ওপর ভাদ্রের ভ্যাপসা গরম। তীব্র তাপ ও ঘামে নাজেহাল নগরবাসীর কাছে তৃষ্ণা মেটাতে ডাবের পানি এখন বেশ জনপ্রিয়। আর এই বাড়তি চাহিদার সুযোগে দামও যেন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

প্রতিদিন ভোরে হাঁটতে বের হন ইউসুফ। পার্কে হাঁটা শেষে বাড়ি ফেরার পথে একটি ডাবের পানি পান করা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানে ডাবের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন সেই অভ্যাসও তার কাছে ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, কয়েক দিন আগেও ছোট আকারের ডাব ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় পাওয়া যেত। এখন সেই একই ডাবের জন্য ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা দিতে হচ্ছে। আর একটু বড় ডাবের দাম ২১০ থেকে ২২০ টাকা। শরীর ঠান্ডা করতে গিয়ে এখন পকেট গরম হয়ে যাচ্ছে।

মুগদা হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মেয়েকে ভর্তি করিয়েছেন বারিক মিয়া। চিকিৎসকের পরামর্শে মেয়েকে প্রতিদিন তিনটি করে ডাব খাওয়াতে হচ্ছে। অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার খরচের সঙ্গে ডাবের বাড়তি দামও তার জন্য নতুন চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


বারিক মিয়া বলেন, মেয়ের জন্য ডাব কিনতেই হবে। কিন্তু প্রতিদিন তিনটি করে ডাব কিনতে গেলে খরচটা অনেক হয়ে যাচ্ছে। ডাবের দাম যেন একেবারেই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

লালবাগ থেকে ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকার ডাব বিক্রেতা ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যশোর, খুলনা ও ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীতে ডাব আসে। সম্প্রতি পাইকারি পর্যায়েই ডাবের দাম বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন ব্যয়।

কারওয়ান বাজারের ডাব ব্যবসায়ী তালুকদার বলেন, এখন আমাদের লাভের অংশ খুব বেশি থাকে না। মৌসুমের এই সময়ে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকে। পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে কিনতে হয়। ফলে খুচরা বাজারেও দাম বাড়াতে হচ্ছে।

বিক্রেতাদের দাবি, শুধু ব্যবসায়ীদের ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। সরবরাহ কমে যাওয়া, পাইকারি বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ— সব মিলিয়েই খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ছে।

তবে ক্রেতাদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের ভাষ্য, একেক এলাকায় একেক রকম দাম নেওয়া হচ্ছে। কোথাও ডাবের আকারের তুলনায় দাম বেশি, আবার হাসপাতালের আশপাশের দোকানগুলোতে দাম তুলনামূলক আরও চড়া।

বিশেষ করে দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত ডাবের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বেশি দেখা যাচ্ছে। পথচারী, রিকশাচালক ও শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী— সব শ্রেণি-পেশার মানুষই গরমে তৃষ্ণা মেটাতে ডাবের দিকে ঝুঁকছেন।

কিন্তু সবারই প্রশ্ন একটাই— শরীর ঠান্ডা করতে গিয়ে এত টাকা গুনতে হবে কেন?

ডাবের পানি মূলত কচি ডাবের ভেতরের স্বচ্ছ তরল। নিরক্ষীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি প্রাকৃতিক পানীয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ডাবের পানির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
মাটি, আবহাওয়া ও নারিকেলের জাতভেদে ডাবের পানির স্বাদেও ভিন্নতা দেখা যায়। কোথাও তা বেশি মিষ্টি, কোথাও আবার তুলনামূলক কম মিষ্টি। বাংলাদেশের ডাবের পানিতে সাধারণত মিষ্টতার সঙ্গে হালকা নোনতা স্বাদের উপস্থিতিও পাওয়া যায়।

তীব্র গরমে শরীর থেকে ঘামের সঙ্গে পানি ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান বেরিয়ে যায়। এ কারণে ক্লান্তি ও পানিশূন্যতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। ডাবের পানিতে থাকা পানি ও বিভিন্ন ইলেকট্রোলাইট শরীরের তরল ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাবের পানি উপকারী হলেও এটি সব রোগের চিকিৎসা নয়। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, কিডনি বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করা উচিত।
রাজধানীর গরম, ডেঙ্গুর প্রকোপ আর ডাবের বাড়তি চাহিদা— সব মিলিয়ে এখন ডাব যেন শুধু তৃষ্ণা মেটানোর পানীয় নয়, অনেকের কাছে প্রয়োজনীয় পণ্যে পরিণত হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজন যত বাড়ছে, দামও যেন ততটাই নাগালের বাইরে সরে যাচ্ছে।

একসময় সিনেমার গানে ছিল, ‘কচি ডাবের পানি, দু আনায় নাও খেয়ে যাও’। সেই দু আনার দিন পেরিয়ে আজ একটি ডাবের দাম কোথাও কোথাও দুই শতাধিক টাকা। তাই নগরবাসীর আফসোস ‘শরীর জুড়াতে ডাবের পানি আছে, কিন্তু পকেট জুড়ানোর উপায় কোথায়?’

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে


  বিষয়:   পানি  ঠান্ডা  দাম  গরম  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: