জ্বালানি সংকট নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর মতবিনিময় সভায় সারা দেশে চলমান জ্বালানি সংকট নিয়ে চরম উদ্বেগ জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, জ্বালানি সংকটের

2026-09-02T03:00:09+00:00
2026-09-02T03:00:09+00:00
 
  বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অর্থনীতি
এফবিসিসিআইর মতবিনিময় সভা
জ্বালানি সংকট নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:০০ এএম 
এফবিসিসিআইর মতবিনিময় সভা। ছবি : সংগৃহীত
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর মতবিনিময় সভায় সারা দেশে চলমান জ্বালানি সংকট নিয়ে চরম উদ্বেগ জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে শিল্প-কারখানার চাকা বন্ধ হয়ে গেছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চলমান শিল্প-কারখানা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে, নতুন বিনিয়োগের সাহসই পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। 

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ, সরবরাহ, আমদানি ও মূল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক। সভায় খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, মিল মালিক, বিভিন্ন বণিক সমিতির নেতাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। 

Advertisement
মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ী নেতারা সরকারি ঘোষিত নতুন পে-স্কেলের প্রভাব নিয়েও কথা বলেন। তারা বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের পর থেকেই দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের আতঙ্ক ও গভীর অনিশ্চয়তা। 

তবে পে-স্কেলকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সুযোগসন্ধানী অসাধু চক্র যেন কৃত্রিমভাবে নিত্যপণ্যের দাম না বাড়ায়, সে জন্য দেশের ব্যবসায়ীদের প্রতি জোর আহ্বান ও কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই। একই সঙ্গে পে-স্কেলের সঙ্গে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করার তাগিদ দিয়েছে সংগঠনটি।

এ ছাড়া আগামী পবিত্র রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, আমদানি বৃদ্ধি এবং অসাধু মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে অক্টোবরের মধ্যেই ব্যবসায়ীদের নিয়ে পুনরায় ফলোআপ বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সভাপতির বক্তব্যে এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক ব্যবসায়ীদের প্রতি দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক ভূমিকা পালনের কঠোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের পে-স্কেল অনুমোদনের পর থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া নিয়ে গভীর শঙ্কা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। 

বাজারে পণ্যমূল্য যেন অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ী মহল থেকে একটি পরিষ্কার, দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক বার্তা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ব্যবসায়ীদেরই স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসতে হবে এবং সঠিক দামে, সঠিক ওজনে ও মানসম্মত পণ্য বাজারে সরবরাহের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।

সভায় উপস্থিত খুচরা, পাইকারি ব্যবসায়ী এবং বড় করপোরেট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানান, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে কোনো অবস্থাতেই পণ্যের দাম বাড়ার সুযোগ নেই। চিনি, ভোজ্য তেল, ডাল, চাল, আটা ও ময়দাসহ প্রধান নিত্যপণ্যের চাহিদা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি এবং সরবরাহ ঠিক রাখা গেলে বাজার পুরোপুরি স্থিতিশীল থাকবে। তবে উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শিল্প-কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে ঋণপত্র বা এলসি সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত সমাধান করার জোর দাবি জানান তারা। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে বলেন, বিদ্যমান জ্বালানি সংকট ও এলসি জটিলতা অবিলম্বে সমাধান করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা বাজার থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের অপতৎপরতা দূর করার ওপর জোর দেন। মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বলেন, আমদানি ও মিল পর্যায়ে উৎপাদন সচল না থাকলে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন। এ জন্য দ্রুত জ্বালানি সংকট সমাধান ও এলসি জটিলতা নিরসনে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। কারওয়ান বাজার কাঁচামাল আড়ৎ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ফুটপাথের হকার ও নিবন্ধিত না থাকা অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়মিত আইনি তদারকির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় বারবার পণ্যের হাতবদল হওয়ার কারণে বাজারে খুচরা পর্যায়ে দাম অনেক বেড়ে যায়; ফলে এই মধ্যবর্তী হাতবদল কমিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।

সভায় কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবুল কালাম আজাদসহ ভোক্তা অধিকার রক্ষাকারী প্রতিনিধিরা বাজারে সঠিক ওজন, সঠিক মান এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কড়া নজরদারির দাবি জানান। পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ অক্ষুণ্ন রাখতে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধে সরকার ও বেসরকারি খাত উভয়কেই সমানভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে বলে তারা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন বণিক সমিতির নেতারা বাজারে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের চাঁদা ও হয়রানি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরাসরি কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেন।


সভায় সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিনিধি জানান, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের আওতায় তারা ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দেশের প্রায় ১ কোটি পরিবারের কাছে স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রি করে আসছেন। এর পাশাপাশি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় নিম্নআয়ের মানুষের মাঝে স্বল্পমূল্যে চাল বিতরণ অব্যাহত রাখার কথা তুলে ধরেন খাদ্য অধিদফতরের প্রতিনিধি। সরকারি এসব উদ্যোগ দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখতে ভূমিকা রাখছে বলে দাবি করা হলেও উপস্থিত ব্যবসায়ীরা পরামর্শ দেন যে, টিসিবির উচিত কেবল দেশীয় বাজার থেকে পণ্য না কিনে সরাসরি বিকল্প আন্তর্জাতিক উৎস থেকে পণ্য আমদানির সক্ষমতা বাড়িয়ে নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদার করা।

সভায় মুক্ত আলোচনার এক পর্যায়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা পূর্বাভাস সেলের বাণিজ্য পরামর্শক আবু সালেহ মোহাম্মাদ ইমরানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তপ্ত বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এতে সভার স্বাভাবিক পরিবেশ কিছুটা ব্যাহত হলে এফবিসিসিআই প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করেন। ফজলুল হক সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে সাংবাদিকদের ওই বিতর্ক সেখানেই ইতি টেনে সভার মূল উদ্দেশ্যে মনোনিবেশ করার অনুরোধ জানান।

এফবিসিসিআই প্রশাসক স্পষ্ট করেন যে, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আসা বাস্তবসম্মত সুপারিশ ও পরামর্শগুলো গুরুত্বের সঙ্গে লিপিবদ্ধ করে সরকারের নীতিনির্ধারণী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে পৌঁছে দেওয়া হবে। তার নির্ধারিত তিন মাসের মেয়াদের মধ্যে লোকদেখানো বাজার পরিদর্শনের পরিবর্তে কার্যকর নীতিগত বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে চান বলে তিনি উল্লেখ করেন। মো. ফজলুল হক আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এসব সুপারিশের অগ্রগতি ও ফলাফল নিয়ে আগামী অক্টোবর মাসের ভেতরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাদের সম্পৃক্ত করে আরেকটি বড় পরিসরের ফলোআপ বৈঠক করা হবে, যাতে আসন্ন রমজান ও ঈদ উপলক্ষে নিত্যপণ্যের অতিরিক্ত দামের কারণে ভোক্তাদের দুর্ভোগে পড়তে না হয়।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   জ্বালানি  সংকট  ব্যবসায়ী  উদ্বেগ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: