র্যাবের মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেছেন, র্যাবের নেতৃত্বে সারা দেশে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা হতে যাচ্ছে। গত ২৪-এর আন্দোলনে পুলিশসহ সরকারের অন্যান্য বাহিনীর যে অস্ত্র লুণ্ঠিত হয়েছে-সেটা উদ্ধারে দায়িত্ব পেয়েছে র্যাব। এর কার্যক্রম ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এ ব্যাপারে পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। অস্ত্রগুলো উদ্ধার হলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে, দেশ উপকৃত হবে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় র্যাব-৬ খুলনার সদর দফতরে সুন্দরবনের জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ ও অস্ত্র উদ্ধার উপলক্ষ্যে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ সব কথা বলেন।
অভিযানে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার জন্য গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে র্যাব মহাপরিচালক বলেন, তথ্য দাতাদের পরিচয় গোপন রাখা হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে।
এদিকে র্যাব জানায়, গত সোমবার সুন্দরবনের পাঁচটি জলদস্যু বাহিনীর ৫২ জন সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে। পরে রাতে আরও ৭ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে। এ নিয়ে আত্মসমর্পণকারী জলদস্যু হচ্ছে ৫৯ জন। আত্মসমর্পণকারী জলদস্যু সদস্যদের মধ্যে রয়েছে জলদস্যু বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১৬ জন, আনারুল বাহিনীর ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনীর ১৫ জন, আফতাব বাহিনীর ৮ জন ও মিজান বাহিনীর ৭ জন। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৪টি শটগান, ৪৭টি ওয়ান শুটারগান, ৪টি পাইপগান, ৩টি এয়ারগান, ১টি পয়েন্ট ২২ বোর রাইফেল, ৭টি ওয়াকিটকি, ৫৪১ রাউন্ড তাজা গুলি ও ১৪টি খালি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়।
র্যাব মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, সুন্দরবন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের প্রায় ২৫ লাখ মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন হিসেবে কাজ করে। তবে আশির দশক থেকে এই গহীন সুন্দরবন ও সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে জলদস্যুতা ও বনদস্যুতার এক কলঙ্কিত অধ্যায় শুরু হয়েছিল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নীল সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে কিংবা বনে কাঠ, মধু, গোলপাতা সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে জীবিকার উদ্দেশে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষেরা এই বাহিনীগুলোর অত্যাচার, জিম্মি ও অবৈধ চাঁদাবাজির শিকার হয়ে আসছিল। কিন্তু একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে মেহনতি ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর এই ধরনের অন্যায় ও ভয়ভীতি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে র্যাব মহাপরিচালক বলেন, এ পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩১৮ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন আবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ফিরে গেছে।
তিনি বলেন, সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক কারণ, সচেতনতার অভাব, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অনীহা এবং হয়রানির ভয়-এসব কারণে কেউ কেউ আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তবে, ৩১৮ জনের মধ্যে ৩০ জনের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে ফিরে যাওয়া বড় কোনো ব্যাপার নয়।
র্যাব মহাপরিচালক জানান, সুন্দরবনে এখনো চার-পাঁচটি জলদস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনীর সদস্যদেরও অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। আত্মসমর্পণকারীদের জন্য নেওয়া পুনর্বাসন প্যাকেজ দেখে অন্যরাও উৎসাহিত হবে।
র্যাব মহাপরিচালক বলেন, আত্মসমর্পণকারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আগের চেয়ে ভালো পুনর্বাসন ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে আত্মসমর্পণকারীদের অহেতুক মামলা ও হয়রানির বিষয়টিও সামনে এসেছে।
র্যাব মহাপরিচালক আরও বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ ছাড়া কাউকে আটক কিংবা মামলা দেওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে আত্মসমর্পণকারীরা যাতে অহেতুক হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক করা হয়েছে।
সুন্দরবনের নিরাপত্তা জোরদারে সেখানে একটি র্যাব ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। বর্তমানে সুন্দরবন এলাকায় কোস্টগার্ডের একটি ক্যাম্প রয়েছে। সুন্দরবনবাসী চাইলে সেখানে র্যাবের একটি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করতে পারে। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ