ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে মেশিনসহ নানা সংকট রয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবলের অভাবে রাজাপুরের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী কাঠালিয়া, ভান্ডারিয়া, কাউখালী ও নলছিটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংকট নিরসনে বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবুল খায়ের মাহমুদ রাসেল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর শুধু রাজাপুরের মানুষই নির্ভরশীল নন। কাউখালী উপজেলার প্রায় অর্ধেক মানুষ, ভান্ডারিয়ার কিছু এলাকা, কাঠালিয়ার দুই-তিনটি ইউনিয়ন এবং নলছিটির কিছু এলাকার বাসিন্দারাও এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হয় হাসপাতালটিকে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটির এক্স-রে মেশিন অচল রয়েছে। ডা. রাসেল জানান, প্রায় সাত-আট বছর ধরে মেশিনটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। মেশিনটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলও কখনো পদায়ন করা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘এক্স-রে মেশিনের জন্য বারবার চাহিদা দিয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত ও মৌখিকভাবে বিভিন্নভাবে জানিয়েছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও উপদেষ্টার কাছে লিখিত আবেদন করেছি। কিন্তু এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। একজন রোগী পায়ে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন, অথচ এক্স-রে করে চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের বিষয়।’
হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও জনবল সংকটে সেটিও নিয়মিত ব্যবহার করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি ইলেক্ট্রোলাইট মেশিন ও হরমোন অ্যানালাইজার পাওয়া গেলে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব বলে জানান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘ল্যাব চালু আছে। তবে বিকেলে ল্যাব বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ২৪ ঘণ্টা সব ধরনের চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সেবা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।’
হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সেবাতেও রয়েছে জনবল সংকট। প্রায় দুই বছর ধরে অ্যাম্বুলেন্স চালকের পদটি শূন্য রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত জানানো হলেও এখনো চালক নিয়োগ হয়নি বলে জানান ডা. রাসেল।
তিনি বলেন, ‘প্রতিমাসে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় দেওয়া প্রতিবেদনেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সরকারি অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার জন্য শুধু জ্বালানি খরচের টাকা দেওয়া হয়। বাইরে থেকে চালক নিয়োগের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই।’
বর্তমানে জরুরি প্রয়োজনে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার গাড়ির চালককে অ্যাম্বুলেন্স চালানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ও উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সরকারি কাজে হাসপাতালের বাইরে থাকলে অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেওয়াও সম্ভব হয় না।
ডা. রাসেল জানান, বর্তমান জ্বালানি মূল্যে রাজাপুর থেকে বরিশাল যেতে একটি অ্যাম্বুলেন্সে শুধু তেল বাবদ প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকা খরচ হয়।
এত বড় একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী সংরক্ষণের জন্য কোনো স্টোর রুম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ‘সরকারি বরাদ্দের ওষুধ রাখার জন্য আমাদের কোনো স্টোর রুম নেই। বাধ্য হয়ে ওষুধ বিতরণ কেন্দ্রেই সেগুলো রাখতে হচ্ছে। মৌলিক জায়গাগুলোতেই এত ঘাটতি রয়েছে, এগুলো কবে পূরণ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
হাসপাতালে বর্তমানে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তবে জনবল সংকটের কারণে ল্যাব পরিচালনায়ও নানা সমস্যা ছিল বলে জানান ডা. রাসেল। দীর্ঘদিন ল্যাব টেকনিশিয়ান না থাকার পর একজনকে পদায়ন করা হলেও পরে তাকে বদলি করা হয়। এরপর নতুন একজনকে পদায়ন করা হয়েছে।
নতুন টেকনিশিয়ান আসার পর নিয়মিত কিছু পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার চাপও বেড়েছে।
ডা. রাসেল বলেন, ‘একজন রোগী হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে পরীক্ষার জন্য বাইরে যাবে—এটি ভালো ব্যবস্থা হতে পারে না। বর্তমানে হাসপাতালে নিয়মিত বিভিন্ন পরীক্ষা হচ্ছে, এটি আমাদের জন্য বড় পাওয়া।’
হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও এমএলএসএস পদেও রয়েছে তীব্র জনবল সংকট। পাঁচটি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র একজন কর্মরত রয়েছেন। একইভাবে পাঁচটি এমএলএসএস পদের বিপরীতে রয়েছেন একজন।
তবে রোগীদের সেবায় চিকিৎসক, স্বাস্থ্য সহকারী ও নার্সরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। বর্তমানে ভর্তি রোগীদের কাছ থেকে ওয়ার্ডেই নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জরুরি বিভাগে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত কর্মীদের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন ডা. রাসেল। তিনি জানান, দুর্ঘটনা বা একসঙ্গে বেশি রোগী এলে জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত জনবলের প্রয়োজন হয়। তবে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আউটসোর্সিং কর্মীদের মূল দায়িত্বের বাইরে কোনো কাজ করানো যায় না।
তিনি বলেন, জরুরি বিভাগে নিয়োজিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য সহকারীরাই মূল দায়িত্ব পালন করেন। আউটসোর্সিং কর্মীরা প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা করেন।
ডা. রাসেল বলেন, ‘চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ডাক্তার, স্বাস্থ্য সহকারী ও নার্সরা দিনরাত পরিশ্রম করছেন। বাইরে কিছু কথাবার্তা রয়েছে, যা আমাদের এই পরিশ্রমকে ব্যর্থ করে দেয়। আউটসোর্সিংয়ে নিয়োজিত কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আমরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে লিখিতভাবে জানাব। প্রয়োজন হলে তাকে এখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।’
সময়ের আলো/এসএকে