ভয়াবহ বিপর্যয়ের আগে কি আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ ছিল নেপালের? গত ২৬ আগস্ট চীন-নেপাল সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর ভয়াবহ বন্যা ও কাদাধসে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এর প্রায় তিন মাস আগে, মে মাসে, চীনের কাছে হিমবাহের গতিবিধি ও সম্ভাব্য বিপদের আগাম তথ্য চেয়েছিল কাঠমান্ডু। তবে নেপালের কর্মকর্তাদের দাবি, প্রয়োজনীয় সব তথ্য তারা পাননি।
২৭ মে কাঠমান্ডুতে নেপাল ও চীনের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে নেপালের প্রায় ১০ জন এবং চীনের প্রায় ১২ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। বৈঠকে বন্যা, আবহাওয়া ও হিমবাহ-সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবিলায় যৌথ পদক্ষেপ, হিমবাহ হ্রদের তালিকা তৈরি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
নেপালের পক্ষ থেকে হিমবাহের অবস্থার পরিবর্তন, জলস্তরের ওঠানামা এবং সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সরবরাহের ওপর জোর দেওয়া হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল, হিমবাহ এলাকায় অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন শুরু হলে যেন আগেভাগেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।
বৈঠকে উপস্থিত নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের জলবিদ সৌহার্দ্র যোশি রয়টার্সকে বলেন, হিমবাহে প্রাথমিক পর্যায়ের কোনো নড়াচড়া বা পরিবর্তন দেখা দিলে তার তথ্য আগে থেকেই পাওয়া জরুরি। কারণ, হিমবাহের আশপাশে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই তা জানা গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকাকে সতর্ক করা সম্ভব।
নেপালের সরকারি জলবিদ বিনোদ পরাজুলির বক্তব্যেও উঠে এসেছে তথ্যের ঘাটতির বিষয়টি। তাঁর দাবি, চীনের কাছ থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও হিমবাহ ধস, জলস্তরের পরিবর্তন, ভূমিধসসহ অন্যান্য চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়ে একই মাত্রায় তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না।
পরাজুলি জানান, প্রায় এক মাস ধরে চীন উইচ্যাট ও ই-মেইলের মাধ্যমে তিব্বত অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস নেপালকে পাঠাচ্ছিল। তবে নেপালের প্রয়োজন ছিল আরও বিস্তৃত ও তাৎক্ষণিক তথ্য।
এখন হিমবাহ-সংক্রান্ত তথ্য প্রতি ১০ মিনিট অন্তর পাওয়ার ব্যবস্থা চায় নেপাল। পরাজুলির মতে, এমন ব্যবস্থা থাকলে হিমবাহ বা হিমবাহ হ্রদের পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন শনাক্ত করে স্থানীয় মানুষকে সতর্ক করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ বাড়বে।
চীনের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনাও করছে কাঠমান্ডু। ভারতের সঙ্গে নেপালের বিদ্যমান তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থার আদলে চীনের সঙ্গেও একটি কাঠামো গড়ে তুলতে চায় দেশটি।
তবে নেপালের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। নেপালে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের দাবি, দুর্যোগ-সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এবং চীন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সময়মতো নেপালকে দিয়েছে।
একই সঙ্গে দুর্গম হিমালয় অঞ্চলে পর্যবেক্ষণ চালানোর বাস্তব সমস্যার কথাও জানিয়েছে চীন। দেশটির দূতাবাসের বক্তব্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত উচ্চতা, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং সীমিত পর্যবেক্ষণ অবকাঠামোর কারণে হিমবাহের পরিবর্তন আগাম শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।
ফলে ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বিপর্যয়ের আগে নেপালের হাতে আরও কার্যকর আগাম সতর্কতার সুযোগ ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নেপাল যেখানে বলছে, প্রয়োজনীয় তথ্য আরও আগে ও আরও বিস্তৃতভাবে পাওয়া গেলে প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হতো, সেখানে চীনের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তারা সময়মতোই দিয়েছে। দুই দেশের এই ভিন্ন বক্তব্যের মধ্যেই হিমালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সীমান্তপারের তথ্য আদান-প্রদানের সীমাবদ্ধতাগুলো নতুন করে সামনে এসেছে।
সময়ের আলো/টিকে