আত্মবিশ্বাসী ইরানের সামনে ধৈর্যহারা ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ছয় মাস পেরিয়েছে ইরান-মার্কিন যুদ্ধ। প্রথম দফায় ৪০ দিন সম্মুখ যুদ্ধের পর ১৮ জুন সমঝোতা হলেও যুদ্ধবিরতি ভেঙে কয়েক দফা

2026-09-05T23:50:15+00:00
2026-09-05T23:50:15+00:00
 
  শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২১ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ
আত্মবিশ্বাসী ইরানের সামনে ধৈর্যহারা ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫০ পিএম 
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
ছয় মাস পেরিয়েছে ইরান-মার্কিন যুদ্ধ। প্রথম দফায় ৪০ দিন সম্মুখ যুদ্ধের পর ১৮ জুন সমঝোতা হলেও যুদ্ধবিরতি ভেঙে কয়েক দফা সংঘর্ষে জড়ায় দুই পক্ষ। বর্তমানে ফ্রন্ট-লাইন যুদ্ধের তীব্রতা কমলেও ইরানকে ‘একঘরে’ করতে আর্থিক চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ যুদ্ধ শেষ করার জন্য সময়সীমা জানাতে পারেননি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ভ্যান্স বলেন, ইরান যুদ্ধ আসলে কোনো ‘যুদ্ধ’ না। 

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরান-মার্কিন যুদ্ধ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস (এনওয়াইটি)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করছে, ছয় মাস যুদ্ধের পর ইরান আরও ‘আত্মবিশ্বাসী’ হয়ে উঠেছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার জন্য তেহরানের কাছে পর্যাপ্ত সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরির সক্ষমতা রয়েছে বলে সে বিশ্বাস ক্রমশ বাড়ছে। তার বিপরীতে ধৈর্যহারা হয়ে পড়ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

Advertisement
গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, যুদ্ধের সময় ইরানের নেতৃত্ব আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তেহরানের কাছে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে। এমন অবস্থায় তেহরান আরও কয়েক মাস ধরে এই সংঘাত চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। এ ছাড়া বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্যও পূর্বপ্রস্তুতি নিয়েছে তেহরান। পত্রিকাটির প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বর্তমান এই মূল্যায়ন যুদ্ধের শুরুতে করা ধারণার তুলনায় একটি বড় পরিবর্তন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দ্রুত শেষ এবং সুনির্দিষ্ট বিজয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এনওয়াইটিকে দেওয়া গোয়েন্দা মূল্যায়নের বর্ণনা অনুযায়ী কয়েক মাস ধরে চলা বিচ্ছিন্ন যুদ্ধের পর ইরান নিজেদের সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কী ধরনের চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে— সে সম্পর্কে অনেক বেশি স্পষ্ট ধারণা পেয়েছে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সক্ষমতা নিয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং ওয়াশিংটনকে এখনই কোনো ছাড় দেওয়ার তেমন কারণ দেখছে না। 

চলতি সপ্তাহে ফের উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই এ গোয়েন্দা মূল্যায়ন যুদ্ধের গতিপথ সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানি হামলার পর বর্তমানে পাল্টাপাল্টি হামলা আগের তুলনায় সীমিত হয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এর আড়ালে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছে। ছয় মাসের যুদ্ধ থেকে ইরান বড় ধরনের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা নিয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসকে হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য প্রতিনিধি জেসন ক্রো বলেছেন, ইরানিরা তাদের অবস্থান নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী বোধ করছে। তেহরানের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে। তিনি জানান, যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করেছে ইরান। কিন্তু তাদের বিদ্যমান কৌশল ও ব্যবস্থার মধ্যে এই ক্ষয়ক্ষতি সবসময়ই বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তার মতে, তেহরান ‘অনেক দীর্ঘমেয়াদি খেলা’ খেলছে। ইরানের কাছে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে এবং যুদ্ধের সময় দেশটির নেতৃত্ব আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

এই যুদ্ধে তেহরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি তাদের জন্য একটি কৌশলগত প্রভাব বাড়াচ্ছে। যুদ্ধের আগে এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজকে চাপ প্রয়োগের একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। কিন্তু ছয় মাসের সংঘাতের পর মার্কিন কর্মকর্তারা এখন মনে করছেন, প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ তাদের কতটা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব দিতে পারে— ইরান তা আরও সুনির্দিষ্টভাবে বুঝতে পেরেছে।

ক্রো বলেন, তারা সবসময়ই জানত যে প্রণালিটি একটি বড় দরকষাকষির হাতিয়ার। কিন্তু এখন তারা আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করেছে যে এর মাধ্যমে তারা কতটা প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। এই মূল্যায়ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, সময়ের সঙ্গে হরমুজের কৌশলগত গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া সম্ভব। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এ সপ্তাহে বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পাইপলাইন ব্যবস্থা গড়ে তুললে দুই বছরের মধ্যে হরমুজ প্রণালি একটি ‘মূল্যহীন জলভাগে’ পরিণত হতে পারে।


তবে এই মুহূর্তে হরমুজের অর্থনৈতিক প্রভাব যথেষ্ট বড়। অপরিশোধিত (ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল) তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ ডলারের ওপরে রয়েছে এবং হরমুজে বাধার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও জ্বালানির দাম বেড়েছে। সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েট প্রেস জানিয়েছে, প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী তেল সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হলেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এখনও যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম।

গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবহিত কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের আত্মবিশ্বাস শুধু তাদের নিজেদের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে না। তেহরান হয়তো মনে করছে, আরও একটি বড় ধরনের অভিযান দীর্ঘ সময় চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সক্ষমতা ক্রমশ সীমিত হয়ে আসছে। কর্মকর্তারা টাইমসকে বলেছেন, ইরান সম্ভবত মার্কিন গোলাবারুদের মজুদ কমে যাওয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছে। তাদের ধারণা, এর ফলে ওয়াশিংটন আরেকটি বড় আকারের হামলা চালানোর ক্ষেত্রে অনীহা দেখাবে।

যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে যেমন কৌশলগত পরিস্থিতি তৈরির কথা বিবেচনা করা হয়েছিল তা পাল্টে গেছে। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। অক্ষ শক্তির ধারণা ছিল, তাদের অব্যাহত হামলার প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়াকে ইরানের জন্য অসহনীয় করে তুলবে। কিন্তু এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আর্থিক খাতে চাপ প্রয়োগের কৌশল তেমন পাত্তা না দিয়ে প্রতিপক্ষের ওপরও কী ধরনের মূল্য চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে সেটি হিসাব করছে তেহরান।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন আগামী নভেম্বরের ৩ তারিখ অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনকেও একটি কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছে ইরান। ওয়াশিংটনের মূল্যায়নে এ তথ্যও উঠে এসেছে। বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হবে। এ বিষয়টিকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান।

হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য প্রতিনিধি জোশ গটহাইমার ইরানের এ কৌশলের সরাসরি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরানিরা মনে করছে তাদের হাতে সর্বোচ্চ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। সুতরাং তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচন ঘিরে প্রেসিডেন্টকে আরও চাপে রাখার কথাই বিবেচিত হবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। গত শুক্রবার রয়টার্স/ইপসোসের একটি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৫ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন যে যুদ্ধের খরচের তুলনায় এর সুফল বেশি কিংবা যথেষ্ট। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও নিজেদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবে ইরান। এ ক্ষেত্রে সাইবার অ্যাটাকে পারদর্শী হচ্ছে ইরানের হ্যাকাররা। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, জুলাইয়ের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০টির বেশি পানি সরবরাহ ব্যবস্থার হামলার পেছনে সম্ভবত ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকার গ্রুপরা কাজ করেছে।

এসব হামলার কারণে পানীয় জল অনিরাপদ না হলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে। এর ফলে ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপ এবং সতর্কতামূলকভাবে পানি ফুটিয়ে পান করার নির্দেশ দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে সাইবার হামলার আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এসব ব্যবস্থায় তারা সফলভাবে প্রবেশ করতে পেরেছে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   আত্মবিশ্বাস  ইরান  ধৈর্যহারা ট্রাম্প  নিউইয়র্ক টাইমস  বিশ্লেষণ 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: