বিশ্বে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ও তাদের সম্পদ গত বছর নতুন রেকর্ড গড়েছে। ২০২৫ সালে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৭৯৫ জনে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ২ শতাংশ বেশি এবং গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। একই সময়ে তাদের সম্মিলিত সম্পদ বেড়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রথমবারের মতো তা ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা ছাড়িয়ে বছর শেষে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে।
বৈশি^ক সম্পদবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান আলট্রাটার ‘বিলিয়নিয়ার সেনসাস ২০২৬’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে বিশ্বে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। নতুন প্রযুক্তি খাতের প্রসার, শেয়ারবাজারের উত্থান এবং বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ঘিরে বিনিয়োগের প্রবল বৃদ্ধি গত বছরের সম্পদ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। আলট্রাটা, ‘বিলিয়নিয়ার সেনসাস ২০২৬’।
আলট্রাটার বিশ্বের বিলিয়নিয়ারদের সম্পদে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখা ১৫০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এআইয়ে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য এ খাতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করা কোম্পানির চেয়ে ২৩ শতাংশ দ্রুত বেড়েছে। এসব কোম্পানির শেয়ারের মূল্য বাড়ায় প্রতিষ্ঠাতা ও বড় শেয়ারধারীদের সম্পদের পরিমাণও বেড়েছে।
তবে শুধু এআই বা প্রযুক্তি খাতই বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ বৃদ্ধির কারণ নয়। আলট্রাটার হিসাবে, মহামারির পর এই প্রথম গত বছর বড় সব সম্পদশ্রেণিতেই ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে। শেয়ারবাজারে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ্বের বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদহার কমানোও সম্পদ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
সর্বাধিক বিলিয়নিয়ার উত্তর আমেরিকায় : অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বিলিয়নিয়ার রয়েছেন উত্তর আমেরিকায়। ২০২৫ সালে এ অঞ্চলে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৩৭ জন। এক বছরে এ সংখ্যা বেড়েছে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, যা সব অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ। উত্তর আমেরিকার বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা বিশ্বের মোট বিলিয়নিয়ারের ৩৫ শতাংশ।
ইউরোপে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৮১ জনে দাঁড়িয়েছে। আর এশিয়ায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধির পর বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা হয়েছে ৮৮১ জন। দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি বিলিয়নিয়ার রয়েছেন। ২০২৫ সালে দেশটিতে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ১১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ২৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বে যত বিলিয়নিয়ার রয়েছেন, তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই যুক্তরাষ্ট্রের। দেশটির বিলিয়নিয়ারদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬ দশমিক ৬৯ ট্রিলিয়ন ডলার।
২৯ জনের হাতে ২৭ শতাংশ সম্পদ : বিলিয়নিয়ারদের সংখ্যা বাড়লেও তাদের মধ্যে সম্পদের বণ্টন সমান নয়। বরং শীর্ষ ধনীদের হাতে সম্পদ আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক ২৯ জনকে আলট্রাটা ‘সুপার বিলিয়নিয়ার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা বিশ্বের মোট বিলিয়নিয়ারের মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ তাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ৪ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের সব বিলিয়নিয়ারের মোট সম্পদের ২৭ শতাংশ।
২০১৭ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক ছিলেন মাত্র ১০ জন। তখন তাদের হাতে ছিল বিশ্বের বিলিয়নিয়ারদের মোট সম্পদের ৭ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ আট বছরে সুপার বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়েছে। একই সময়ে তাদের হাতে থাকা সম্পদের অংশও প্রায় চারগুণ বেড়েছে।
অন্যদিকে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক বিলিয়নিয়ারের সম্পদের পরিমাণ ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। আরও এক-তৃতীয়াংশের সম্পদ ২ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। অর্থাৎ ১ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিকরাই মোট বিলিয়নিয়ারের ৮২ শতাংশ।
সম্পদের বড় অংশ শেয়ারে : বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ বৃদ্ধির বড় একটি অংশ আসলে নগদ অর্থ নয়। তাদের সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগ করা। ফলে কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লে তাদের সম্পদের হিসাবও দ্রুত বেড়ে যায়। আবার বাজারে দরপতন হলে একইভাবে কমে যেতে পারে।
বিশেষ করে প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের দামে সাম্প্রতিক বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। এআই ঘিরে বিপুল বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ ফলাফল নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন থাকায় প্রযুক্তি খাতে বাজার অস্থিরতাও তৈরি হয়েছে। ফলে এআইনির্ভর কোম্পানিতে সম্পদ বেশি কেন্দ্রীভূত থাকা বিলিয়নিয়ারদের সম্পদেও ভবিষ্যতে বড় ধরনের ওঠানামা হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।
আলট্রাটার গবেষণাপ্রধান মায়া ইমবার্গ বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় সম্পদ কেন্দ্রীভূত থাকা শীর্ষ বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ এআই সংক্রান্ত বাজারের প্রবণতার সঙ্গে বাড়তে ও কমতে পারে।
ইউবিএসের হিসাবেও সম্পদ বেড়েছে : বিশ্বের ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির একই প্রবণতা উঠে এসেছে সুইস ব্যাংক ইউবিএসের ‘বিলিয়নিয়ার অ্যাম্বিশনস রিপোর্ট ২০২৫’-এ। তবে দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ইউবিএসের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯১৯ জন। তাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৫ দশমিক ৭৮১ ট্রিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি এবং এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ।
আলট্রাটা ও ইউবিএসের হিসাবে পার্থক্যের কারণ তাদের তথ্য সংগ্রহ ও সম্পদ গণনার পদ্ধতিগত ভিন্নতা। আলট্রাটা ১ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি সম্পদের ব্যক্তিদের হিসাবে নেয়। অন্যদিকে ইউবিএস পরিবারভিত্তিক সম্পদসহ কিছু ভিন্ন মানদ- ব্যবহার করে।
সব মিলিয়ে, বিশ্বের বিলিয়নিয়ারদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি তাদের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। তবে সেই সম্পদের বড় অংশ অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় বিশ্বে সম্পদবৈষম্যের চিত্রও আরও স্পষ্ট হচ্ছে। প্রযুক্তি ও শেয়ারবাজারের উত্থান এই সম্পদ বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করলেও বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এলে শীর্ষ ধনীদের সম্পদেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্টি/এসএকে