তুচ্ছ ঘটনা, আধিপত্য বিস্তার, সামাজিক বিরোধ কিংবা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব— বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায়। এসব ঘটনায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায়সহ অনেক সময় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। সংঘর্ষের সময় ভাঙচুর করা হচ্ছে ঘরবাড়ি, লুটপাটের হচ্ছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মানুষের সহায়-সম্বল।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জেলার বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে শুধু শত শত মানুষ আহতই হচ্ছেন না, ঘটছে প্রাণহানির ঘটনাও। প্রশ্ন উঠছে— কেন বারবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন হবিগঞ্জের মানুষ? এর পেছনে দায়ীই বা কারা?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হবিগঞ্জ জেলায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৯৫টি। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ হাজার ১৯৯ জন এবং নিহত হয়েছেন ১৯ জন। এছাড়াও অসংখ্য মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই জেলায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১০৪টি। এতে আহত হয়েছেন ৮৬০ জন এবং নিহত হয়েছেন আরও ১৯ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের মাত্র আট মাসেই সংঘর্ষের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে পুরো ২০২৫ সালের সংখ্যাকে। প্রাণহানির সংখ্যাও ইতোমধ্যে গত বছরের সমান হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে ছোটোখাটো বিরোধ অনেক সময় গ্রামের মুরুব্বি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্যোগে সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে মীমাংসা করা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সামাজিক উদ্যোগ ও পারস্পরিক বন্ধন অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীগত বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার এবং সামাজিক প্রভাব ধরে রাখার প্রতিযোগিতা অনেক সময় সামান্য ঘটনাকেও ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ দিচ্ছে।
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ জেলায় বর্তমানে প্রায় ২৩ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৬ মানুষের বসবাস। জেলার প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীর মধ্যে ৩৯ দশমিক ১৪ শতাংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা কোনো প্রশিক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিপুলসংখ্যক তরুণের একটি অংশ কর্মহীন ও অনিশ্চিত অবস্থায় থাকায় তারা সামাজিক সংঘাত ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জ জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট ত্রিলোক কান্তি চৌধুরী বিজন সময়ের আলোকে জানান, আগে সমাজে যে ধরনের সামাজিক বন্ধন ও মুরব্বিদের প্রতি আস্থা ছিল, তা এখন অনেকটাই কমে গেছে। সবাই ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রবণতায় ব্যস্ত। দ্রুত সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে এসবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা না গেলে পুলিশের একার পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
হবিগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মঞ্জুর উদ্দিন আহমেদ শাহীন বলেন, মসজিদে নামাজ পড়াকে কেন্দ্র করে মসজিদের ভেতরে মারামারির মতো ঘটনাও ঘটছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সম্মিলিতভাবে এখনই এসব ঘটনা রোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে আমাদের আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ জানান, এলাকা ভিত্তিক স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় ব্লক রেইডসহ বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের মাধ্যমে সংঘর্ষের প্রবণতা কমাতে কাজ করছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়, সংঘর্ষ কমাতে প্রয়োজন পরিবার, সমাজ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্মিলিত উদ্যোগ। অন্যথায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের এই ভয়াবহ প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
সময়ের আলো/জোই