এক মামলায় আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা খরচা আরোপের আদেশের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকনের উপস্থাপনের এক পর্যায়ে এজলাস ত্যাগ করেছেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ। মঙ্গলবার দুপুর ১২টার পর আপিল বিভাগের আদালত কক্ষে (এজলাস-১) এ ঘটনা ঘটে। এরপর আদালত বসেননি বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সূত্র। এদিকে প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগের বিষয়ে কথা বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
পরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের বলেন, আপিল বিভাগের এক নম্বর আইটেমে থাকা মামলায় সকালে নারী আইনজীবীকে কস্ট (খরচা আরোপ) দেওয়া হয়। জরিমানা করা হয় পাঁচ লাখ টাকা। আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় থাকা ১৩ নম্বর মামলা (আইটেম) শেষ হওয়ার পর প্রধান বিচারপতিকে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর মামলা খুব একটা হচ্ছে না আপিল বিভাগে।
আইনজীবীদের আয় কমে গেছে উল্লেখ করে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, একজন জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা কস্ট দেওয়া অনেক বেশি হয়ে গেছে। তাকে মাফ করে দেন। তখন তিনি বললেন, ‘আমি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’ আমি তখন বললাম, ইনকাম ওই সেন্সে কমে গেছে... বোঝাতে চেয়েছি আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিল। তিনটা বেঞ্চ ছিল। এখন একটা বেঞ্চ।
হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে মাহবুব উদ্দিন খোকন আরও বলেন, একটা মামলা স্টে হলে... সেখানে শুনানি করতে পারছি না। এমনকি চেম্বার আদালতে স্টে করছে, তা হিয়ারিং করতে এক বছর লাগে। ওখানে কোনো মেনশন করা যায় না— কেন এই মামলাটা ওপরে ছিল (কজলিস্টে), নিচে গেলে কেন এবং যেহেতু একটা বেঞ্চ, মানুষ দীর্ঘদিন থেকে ন্যায়বিচার পাচ্ছে না, মামলা শুনানি করতে পারছে না। মামলা হলে আইনজীবীদের ইনকাম হবে। কম হোক, বেশি হোক। আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম। আমি চিন্তা করিনি যে, তিনি এত রিঅ্যাক্ট করবেন। তারা তো রাগ-অভিমানের ঊর্ধ্বে বিচার করার কথা। আর আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে আমার অবলিগেশন আছে তার কাছে আইনজীবীদের পক্ষে আবেদন করার।
এদিকে প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগের বিষয়ে কথা বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল। নিজ কার্যালয়ে দুপুর সোয়া ২টার দিকে ব্রিফিং করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। এ সময় তিনি বলেন, তিনি (সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন) আইনজীবীদের কল্যাণে ও স্বার্থে কিছু কথা প্রধান বিচারপতির কাছে বলেছেন বলে দাবি করেছেন। আসলে এমন কোনো কথা আজকের মামলার প্রসিডিংয়ে (কার্যধারা) হয়নি। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি বিচারিক শৃঙ্খলা, সততাকে প্রাধান্য দেন। কোনো প্রতারণা যদি দেখেন, তা সিরিয়াসলি ডিল (গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন) করেন।
২০১৩ সালে একজন কাজি নিয়োগ থেকে শুরু হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে রুহুল কুদ্দুস বলেন, যেখানে মামলার বাদী পাঁচটি রিট দায়ের করেছেন একই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে... পাঁচটি রিট দায়ের করেছেন, অথচ পূর্বে রিজেক্ট হওয়ার আদেশটি পরবর্তী রিটে উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে নারী আইনজীবীকে আজ আপিল বিভাগ ফাইন করেছেন পাঁচ লাখ টাকা এবং রিট আবেদনকারীকে পাঁচ লাখ টাকা, যে টাকা সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নারী আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী মামলায় সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। সকালে যখন আদেশ হয়, তখন নারী আইনজীবী আমার পাশে বসে আদেশটি শুনেছেন; মাহবুব উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন না।’
ওই মামলায় সকাল সোয়া ৯টার দিকে আদেশ হয় বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, আর এ ঘটনার (এজলাস ত্যাগ) অবতারণা হয়েছে ১২টা ৩৫ সময়।... অন্য একটি মামলার সময় মাহবুব উদ্দিন খোকন ওই প্রসঙ্গে (খরচা আরোপ) বললেন যে, ‘একজন আইনজীবীকে আপনারা ফাইন করেছেন।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘দেখেন, আমরা সবকিছুতে দেখেশুনে একটা আদেশ দিয়েছি, আমাদের আদেশ আমরা পরিবর্তন করব না। কারণ তাদের (আদালত) বক্তব্য অনুযায়ী সিরিয়াস ফ্রড করা হয়েছে। আদালতের সঙ্গে প্রতারণা এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ইতিপূর্বের আদেশও ফ্রড করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বললেন, আপনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) এটা বলবেন না।’
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তখন অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলে ফেললেন, ‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’ বিষয়টি প্রধান বিচারপতি একটু লাইটলি নিলেন। তারপরে বললেন, ‘আপনি (মাহবুব উদ্দিন খোকন) কি এটা মিন করেন?’ মাহবুব উদ্দিন খোকন অনেকটা সেই একই কথা বলার যখন চেষ্টা করেন, তখন প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘আপনি (খোকন) যে কথাটা বলেছেন, সেটি অ্যাবসলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজকে আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না।’ এ কথা বলে তিনি (প্রধান বিচারপতি) উঠে (এজলাস থেকে) গেছেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি