কোথাও রিকশা মেরামত কোথাও চালকদের বিশ্রাম, কেউ বা এক বেলা গাড়ি চালিয়ে খাওয়ার জন্য আবার ফিরেছেন গ্যারেজে। দিনের আলোতে রাজধানীর রিকশা গ্যারেজগুলোতে এমন চিত্র দেখা গেলেও রাত নামতেই পাল্টে যায় চিত্র। ক্লান্ত চালকরা রিকশা রেখে বিশ্রাম কিংবা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলেও রাতের গভীরে গ্যারেজে পা ফেলে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা।
একপাশের জায়গা নিয়ে দীর্ঘসময় ধরে চলে তাদের মাদকের আসর। ভয়ে সেই আসরে কী চলে তা দেখতে আসেন না রিকশাচালকরা। গ্যারেজ মালিকদের যোগসাজশে এভাবে প্রতিনিয়তই মাদকের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে গ্যারেজগুলোকে ব্যবহার করছে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। আর মাদক নিয়ে মতবিরোধ কিংবা নিয়ন্ত্রণ-আধিপত্য দেখা দিলেই ঘটে হত্যার ঘটনা। এদিকে গ্যারেজগুলো ঘিরে চাঁদা আদায় করে থাকে সেই সন্ত্রাসীরা।
রাজধানীজুড়ে পাঁচ হাজারের মতো রিকশার গ্যারেজ থাকলেও সেখানে হওয়া মাদক-জুয়াসহ অপরাধ কমাতে স্পষ্ট কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। ফলে দিন দিন যেন দৌরাত্ম্য বাড়ছে সন্ত্রাসীসহ মাদক কারবারিদের।
গত রোববার রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুর সরদার গলিতে থাকা শরীফ গ্যারেজে খুনের ঘটনায় গ্যারেজ ঘিরে অপরাধের এই চিত্র আবারও সামনে এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রোববার রাতে গ্যারেজে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন সেখানকার রিকশা ব্যবসায়ী ইমরান ও সাদ্দাম। সে সময় তিনটি মোটরসাইকেলে করে সাতজন সন্ত্রাসী এসে গ্যারেজে ঢুকে। একপর্যায়ে একাধিক গুলির শব্দ শুনতে পারেন সেখানকার রিকশাচালকরা। চালকরা কিছু বুঝে উঠার আগেই সন্ত্রাসীরা ইমরান ও সাদ্দামকে গুলি করে। এ সময় ভয়ে তাদের সামনে আসেননি কোনো রিকশাচালক। এদিকে ঘটনার সময় ওই গ্যারেজে রাজু নামে এক চালক মোবাইলফোনে টিকটক দেখার সময় তাকে ডেকে মোবাইল কেড়ে নেয় তারা। পরে সেই মোবাইল ফেরত চাইলে মোবাইলের মালিককে চাপাতি দিয়ে জখম করা হয়।
সোমবার গ্যারেজটিতে সরেজমিন গেলে হত্যার সময় গ্যারেজে থাকা ও ভিডিওর দায়ে ছিনিয়ে নেওয়া মোবাইলের মালিক তাপসের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সময়ের আলোকে বলেন, মোট সাতজন এসেছে। তাদের কারোরই চেহারা দেখা যায়নি। তাদের মধ্যে দুজন মুখোশ পরা, দুজন হেলমেট পরা ও বাকি তিনজন মাস্ক পরা ছিল। ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই হত্যার ঘটনাটি ঘটে। পরে গ্যারেজের একজন আমার মোবাইল দিয়ে টিকটক দেখছিল। পরে তারা ভেবেছে সে ভিডিও করেছে তাই মোবাইলটি নিয়ে চলে গেছে। পরে আমি তারা চলে যাওয়ার সময় বলি ‘মোবাইল দিয়ে কোনো ভিডিও করা হয়নি এবং আমি গরিব মানুষ মোবাইলটি দিয়ে দেন’, এ কথা শুনে তাদের একজন আমাকে চাপাতি দিয়ে পায়ে কোপ দিয়ে চলে যায়।
এ ছাড়া সন্ত্রাসীরা ইমরানকে খুন করার পর সেখান থেকে ইমরান ও সাদ্দামের কাছ থেকে ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, দুটি মোবাইল ফোন ও ইমরানের মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন নিহত ইমরান ও আহত সাদ্দামের পরিবার। এ ছাড়া তাকে হত্যা করার কারণ হিসেবে তারা জানায়, অভিযুক্তরা ইমরানের কাছে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে, তা না দেওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়।
তবে পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা। ইমনার ও হত্যাকারীদের মধ্যে মাদকের আধিপত্য বা বিরোধের কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। তাদের ভাষ্য, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে মাদকের কারণেই হত্যাটি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার মাদকের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য চাঁদাবাজির কথা সামনে আনছেন বলে ধারণা করছেন তারা। হত্যার ঘটনায় থানায় রিয়াজুল ও উজ্জল— দুজনের নাম উল্লেখ ও ৮-১০ জনকে অজ্ঞাতনামা করে থানায় মামলার কার্যক্রম চলছে বলে জানা গেছে।
এদিকে শুধু স্থানীয় সন্ত্রাসীরাই গ্যারেজগুলোতে মাদকের আসর কিংবা কেনাবেচায় ব্যবহার করে না, অবাধ সুযোগে ও সহজলভ্যতায় রিকশাচালকরাও জড়িয়ে পড়ছে মাদক কারবারে। সেই সঙ্গে নিজেরাও অবাধে গ্রহণ করছেন মাদক। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রায় ৩৪ শতাংশ চালক নিয়মিত ইয়াবা ও গাঁজার মতো মাদক সেবন করেনবলে জানা যায়।
এ ছাড়া খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যাত্রাবাড়ীতে ওই হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না গ্যারেজটির মালিক শরীফ। পরে ওই গ্যারেজে কথা বলে জানা যায়, ওই গ্যারেজের এক চালক রাজধানীতে ইয়াবা চোরাচালান করতে গিয়ে পুলিশের কাছে আটক হয়। পরে ইয়াবাসহ ওই চালকে আটক করে জব্দকৃত রিকশা সংশ্লিষ্ট থানায় রেখে দেওয়া হয়। সেই রিকশা ছাড়িয়ে আনতে তখন ওই থানায় যান শরীফ। শুধু এই গ্যারেজেরই নয়, এর আগেও রাজধানীতে মাদক চোরাচালানকালে একাধিক রিকশাচালককে পুলিশ আটক করে।
এ ছাড়া গ্যারেজে থাকা মালিকরাও রিকশাচালকদের মাদক আনা-নেওয়ায় ব্যবহার করে থাকে বলে জানিয়েছেন একাধিক চালক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধলপুর এলাকার একটি গ্যারেজের এক চালক জানান, মাঝেমধ্যে ভাই (গ্যারেজ মালিক) বলেন যে, চল ধানমন্ডি যাই আপ-ডাউন। তখন আমরা তাকে নিয়ে যাই। এ সময় যেভাবে যাই আবার তাকে সেভাবে নিয়ে আসি। এমন হয় প্রায়ই। আমরা তো বুুঝি যে তিনি কী নিয়ে যান!
এ ছাড়া গত ৬ আগস্ট রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ টানপাড়া জামতলার একটি রিকশা গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে ২০ পিস ইয়াবাসহ শাকিল মিয়া (২৪) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। ওই গ্যারেজে রাতের আঁধারে মাদক কারবার হয় বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল স্থানীয় বাসিন্দাদের।
এদিকে শাহআলী পুলিশ থানার কাছেই জুয়েল নামে এক ব্যক্তির একটি গ্যারেজ রয়েছে। সেখানেও মাদকের ব্যাপক কারবার চলে বলে জানা গেছে। তবে এখানকারসহ নানা জায়গায় থানার কাছাকাছি গ্যারেজ থাকলেও সেখানে মাদকসহ নানা অপকর্মের ঘটনায় পুলিশের যথাযথ পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। ফলে এসব রিকশার গ্যারেজ ঘিরে বাড়ছে অপরাধ। যার শিকার দিন দিন শক্ত হচ্ছে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়া গ্যারেজগুলোকে ঘিরে ব্যাপক চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটে থাকে। আর চাঁদা না দিলে মারধর ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে নিয়ম করে। তবে রাজধানীতে থাকা গ্যারেজগুলোর সিংহভাগই অনানুষ্ঠানিক বা অস্থায়ীভাবে গড়ে উঠেছে। যেখানে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ রাখা হয়েছে। ফলে বেশ বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে সরকারের।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, মাদকের উৎস যেখানেই থাকুক আমরা অভিযান চালাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের সোর্স ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী কাজ চলছে। স্বাভাবিক অভিযান চালালেও গ্যারেজগুলোতে আদৌ পুলিশ পর্যাপ্ত অভিযান চালাচ্ছে কি না— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এক কথায় আমরা সর্বত্রই কাজ করছি। কেউ ইনফরমেশন দিলে সেখানেও কাজ করব।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি