বিশালাকৃতির তিমিটি দেখতে নদীর তীরে উৎসুক মানুষ। ছবি : সময়ের আলো বরগুনার তালতলীতে আন্দারমানিক নদীর তীরে ভেসে এসেছে প্রায় ৩২ ফুট দীর্ঘ একটি মৃত তিমি। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ৭টার দিকে উপজেলার বড়বগি ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামের কাছে নদীর তীরে স্থানীয়রা তিমিটির মরদেহ দেখতে পান। খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশালাকৃতির তিমিটি দেখতে নদীর তীরে ভিড় করেন উৎসুক মানুষ।
স্থানীয়দের ধারণা, বঙ্গোপসাগর থেকে স্রোতের সঙ্গে ভেসে তিমিটির মরদেহ আন্দারমানিক নদীর মোহনায় এসে পৌঁছেছে। পরে বেলা ১১টার দিকে মরদেহটি আবার গভীর সমুদ্রের দিকে ভেসে যেতে শুরু করে। খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তিমিটির মরদেহ উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করেন।
তালতলী বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, কলাপাড়া ও তালতলীর সীমান্তবর্তী আন্দারমানিক নদীর দিকে মৃত তিমিটি ভেসে যাচ্ছিল। সেটিকে নিশানবাড়িয়ার দিকে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। সেখানে মাটিচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। তবে তার আগে তিমিটির প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিভিন্ন নমুনা সংরক্ষণ করা হবে।
পরিবেশকর্মী ও কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির আরিফুর রহমান বলেন, উপকূলে বারবার তিমি, ডলফিনসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর মৃতদেহ ভেসে আসা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। মৃত তিমিটির হাড় সংরক্ষণ করে গবেষণা ও শিক্ষামূলক কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। আর অবশিষ্টাংশ দ্রুত মাটিচাপা দেওয়া না হলে পচে গিয়ে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, মৃত ও আহত সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এ কারণে ডলফিনসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিমিটির মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পরিবেশকর্মীদের ধারণা, মাছ ধরার জালে আটকা পড়া, বড় কোনো সামুদ্রিক জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ, সামুদ্রিক দূষণ, প্লাস্টিক গ্রহণ কিংবা অন্য কোনো কারণে তিমিটির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ছবিতে দেখা বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে এটি একটি বেলিন তিমি বলে মনে হচ্ছে। সম্ভবত এটি ব্রাইডস তিমি। বঙ্গোপসাগরে এ প্রজাতির তিমি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
তিনি বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া তিমিটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। জালে আটকা পড়া, বড় জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ, সামুদ্রিক দূষণ ও প্লাস্টিক গ্রহণ, অসুস্থ অবস্থায় স্রোতের টানে অগভীর পানিতে চলে আসাসহ বিভিন্ন কারণে তিমিটির মৃত্যু হতে পারে। জোয়ারের সময় নদীতে ঢুকে ভাটার সময় আটকা পড়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। প্রকৃত কারণ জানতে হলে মৃত তিমিটির সরেজমিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, তালতলীর উপকূলে এর আগেও একাধিকবার মৃত তিমি ভেসে আসার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪ সালে উপজেলার জয়ালভাঙ্গা ও নলবুনিয়া এলাকায় পৃথকভাবে দুটি মৃত তিমি পাওয়া যায়। এরপর ২০২৪ সালে ছোনবুনিয়া এলাকায় পায়রা নদীর তীরে আরও একটি মৃত তিমি ভেসে আসে। ফলে উপকূলীয় এলাকায় বারবার তিমি ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর মৃতদেহ ভেসে আসায় এসব প্রাণীর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের দাবি জোরালো হচ্ছে।
এদিকে বিশাল আকৃতির মৃত তিমিটিকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। সকাল থেকেই নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সি মানুষ নদীর তীরে ভিড় করে তিমিটি দেখছেন। উপকূলের নদীতে এত বড় আকৃতির সামুদ্রিক প্রাণীর মরদেহ ভেসে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সময়ের আলো/এনএন